
চাঁদপুর: একমাত্র ছেলে নিশান খান গেল বছর ছাত্র-জনতার আন্দোলন শেষে বিজয় মিছিলে গিয়ে শহীদ হন। এর আগে ছেলেকে বাড়িতে আসার জন্য বার বার অনুরোধ করেন মা রৌশানারা বেগম। কিন্তু মায়ের সাথে শেষ দেখা হয়নি। আজও তিনি ছেলেকে দেখার অপেক্ষা করেন। তবে তিনি ছেলেকে দেখেছেন জীবীত নয়, মৃত অবস্থায় কফিন মোড়ানো। রৌশনারা আরা বেগম ছেলেকে হারিয়ে খুবই শোকাতর।
সম্প্রতি শহীদ নিশানের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় মা-বাবা ও বোনদের সাথে। তবে নিশানের মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী জামেনা তুজ জোহরা (শান্তা) কর্মস্থল ঢাকার সাভার কামাল গার্মেন্টস রোড ডেন মার্কেটের পাশে বাড়া বাসায় দুই সন্তান নিয়ে থাকেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ডেন মার্কেট দোকান নম্বর-১, ব্লক ডি/৪।
শহীদ নিশান খান (৩৭)। জন্ম তারিখ ১৯৮৭ সালের ২ জুন। চাঁদপুর সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের মনোহরখাদি গ্রামের লাভলু ডাক্তার খান বাড়ির হাফেজ খানের একমাত্র ছেলে। ৫ ভাই বোনের মধ্যে তৃতীয়। বড় দুই বোন বিউটি আক্তার (৪২) ও খাদিজা আক্তার (৩৯)। তৃতীয় নিশান এবং ছোট দুই বোনের মধ্যে হাওয়া আক্তার (২৮) ও কনিষ্ঠ বোন জান্নাতুল মাওয়া (১৭)। জান্নাতুল মাওয়া এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
শহীদ নিশান স্থানীয় মনোহরখাদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেন। এরপর পাশবর্তী আমিরাবাদ জিকে উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। পরিবারের অভাব অনটনের কারণে চলে যান ঢাকায়। সাভারে গিয়ে লোকজনের মোবাইলের দোকানে কর্মচারি এবং অন্যান্য কাজও করেছেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে তিনি নিজে বিনিয়োগ করে ফার্নিচারের কাজে ব্যবহৃত ক্যামিকেলের ব্যবসা শুরু করেন।
শহীদ নিশান বিয়ে করেছেন সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দামোদরদী গ্রামের খন্দকার বাড়িতে। তার স্ত্রী জামেনা তুজ জোহরা শান্তা। ২০১৬ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার শ্বশুর খন্দকার আব্দুল মালেক পেশায় কৃষক এবং শ্বাশুড়ি নাজমা বেগম গৃহিনী।
শহীদ নিশানের স্ত্রীর বড় ভাই আতিকুর রহমান টিপু বলেন, তারা দুজনেই ৫ আগস্ট বিকেলে বিজয় মিছিলে বের হন এবং অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তার এক আত্মীয় আহত হয়েছেন বলে তাকে দেখার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সেখানে যাওয়ার সময় সাভার থানার সামনে এনাম মেডিকেল রোড নিশান মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে ছাত্ররা অদর চন্দ্র স্কুলের গেটে এনে রাখেন। সেখান থেকে পৌনে ছয়টার দিকে তাকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
শহীদ নিশান খানের তার স্ত্রী জামেনা তুজ জোহরা শান্তা বলেন, তার ভাই আতিকুর রহমান টিপু ও স্বামী নিশান খান সাভারে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বেশ কয়েকবার গিয়েছেন। ৫ আগষ্ট যখন শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় আনুমানিক বিকাল ৩টার দিকে দুপুরের খাবার খেয়ে বিজয় মিছিলে যান। সেখানে সাভার থানা প্রাঙ্গনে বিজয় মিছিলে পুলিশের সাথে জনগণের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে। ওই সময় হঠাৎ ভারি কোন বস্তু দারা মাথার পিছন দিক থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হন। ওই সময় তার অনেক রক্তক্ষরণ হয়। সেখান থেকে তার সাথে থাকা টিপু দৌড়ে অন্য দিকে গেলেও একজন গুরুতর আহতের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে টিপু এসে দেখেন তার বোন জামাই গুরুতর আহত। তাৎক্ষনিক ঘটনাস্থল থেকে নিশানকে এনাম মেডিকেলে নিয়ে যায়। সেখানে কিছু সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি আরো বলেন, নিশানের মৃত্যুর পর হাসপাতাল থেকে রাতেই তার মরদেহ আমার ভাই টিপুসহ আত্মীয় স্বজনরা বাড়িতে নিয়ে যায়। পরদিন ৬ আগষ্ট সকাল ৯টায় বাড়িতে নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
শহীদ নিশান হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী জামেনা তুজ জোহরা শান্তা বাদী হয়ে সাভার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ৭০ জনকে নামীয় এবং অজ্ঞাতনামা বেশ কয়েকজনকে আসামী করা হয়। এই মামলায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সঠিক বিচারের দাবী করেন বাদী।
জামেনা তুজ জোহরা শান্তা বলেন, আন্দোলনে যাওয়ার সময় আমার স্বামীকে যেতে নিষেধ করি। কারণ তখন আমি অসুস্থ্য। তিনি বলেছেন তোমাদেরকে আল্লাহ রিযিকের ব্যবস্থা করবে। কারণ বিগত দিনে আমি আন্দোলনে গিয়েছি, এখন না গেলে কিভাবে হয়। আর আজকে আমি আন্দন মিছিল শেষে ২০ কেজি মিষ্টি লোকজনকে খাওয়াবো।
তিনি বলেন, আমাদের প্রথম সন্তান মোহাম্মদ তোয়াহা (৬)। আমার স্বামী নিশান খানের মৃত্যুর ৫ মাস পরে জন্মগ্রহণ করে আমাতুর রহমান নিশাত। তার বয়স বর্তমানে ৭ মাস। এই দুই সন্তান নিয়ে আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি। তাদের ভবিষ্যৎ জীবন অনিশ্চিত। কারণ স্বামীর অনপুস্থিতিতে ব্যবসাও সঠিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
এদিকে বাবাকে হারিয়ে বড় ছেলে খুবই মর্মাহত। কারণ তার বাবার সাথে মসজিদে যেত। এখনো বাবাকে খোঁজে। আর তোয়াহার বাবার স্বপ্ন ছিলো ছেলেকে মিজানুর রহমান আজহারীর মতো আলেম তৈরী করবে। সে আলোকে তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছে।
শহীদ নিশান হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী জামেনা তুজ জোহরা শান্তার সাথে আলাপ করে জানাগেছে, তার স্বামীর মৃত্যুর পরে ঢাকায় প্রথমে জামায়াতের পক্ষ থেকে ২লাখ টাকা, বিএনপির পক্ষ থেকে ৫০ হাজার, জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫লাখ এবং চাঁদপুর জেলা প্রশাসন থেকে দুই লাখ টাকা অনুদান পেয়েছেন। সর্বশেষ জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র।
নিশানের বড় বোন খাদিজা আক্তার বলেন, আমার ভাই বয়সে ছোট হলেও আমাদেরকে সব সময় সহযোগিতা করেছেন। কারণ বেশি পড়াশুনা করতে না পারায় কাজে লেগে যায়। তার সব বিষয়ে আমার সাথে বেশি কথা হয়েছে। আন্দোলনের সময় আমার সাথে কথা হত প্রায় সময়। কাজ শেষে আমার সাথে রাতের বেলায় কথা বলতেন। তার স্ত্রী ও সন্তানের বিষয়ে আলাপ করতেন। তবে ভাইয়ের মৃত্যুর পরে আমার বাবা-মা ও ছোট বোন খুবই বেহাল অবস্থায় পড়েছেন। কারণ আমার ভাই ছিলো একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি। ভাইয়ের দাফনের পরে ভাইয়ের স্ত্রী সন্তান নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। ভাইয়ের ব্যবসাসহ সবকিছুই ভাবি দেখশুনা করেন। আমরা এখন পরের বাড়ির বউ। বাবা-মার জন্য কতটুকুই করতে পারি।
ছোট বোন জান্নাতুল মাওয়া বলেন, আমি সবার ছোট। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। আমার পড়ার সব খরচ ভাই দিয়েছে। গত বছর কোরবানির ঈদে ভাইয়ের সাথে সর্বশেষ দেখা হয়। আর মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমার ভবিষ্যৎ পড়াশুনার জন্য খরচ দেয়ার মত কেউ নেই। বাবা খরচ দিতে পারলে পড়া লেখা হবে, না হয় বন্ধ হয়ে যাবে।
নিশানের মা রৌশন আরা বেগম বলেন, আমি এখনো ছেলে বাড়িতে আসবে এমন অপেক্ষায় থাকি। আপনারা কেন আমাকে ছেলের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ছেলের কথা মনে হলে আমার বুক পেটে যায়। ছেলের মৃত্যুর পর আমার সবকিছু শূন্য হয়ে পড়েছে। আমার সংসারকে খুবই গুছিয়ে রেখেছিলো আমার আদরের সন্তান। কারণ দুই মেয়ের পরে আমার ছেলে জন্ম হওয়ায় খুবই আদরের ছিলো নিশান। আমার ছেলের মৃত্যুর পরে বউমা আর নাতিরা ঢাকায় চলে যায়। বউমা এখন আর আসে না। যে কারণে নাতিদেরও মুখ দেখতে পাইনা।
শহীদ নিশানের বাবা হাফেজ খান বলেন, আমি পেশায় কৃষক। আয় রোজগার খুবই কম। ছেলেই ছিলো সংসারের উপার্জন করার একমাত্র অবলম্বন। তার মৃত্যুর পর পরিবারে সব কিছুই অন্ধকার। সরকারি অনুদান যা এসেছে তা বউমার কাছেই দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে আমাদের পরিবারকে ১লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা সবাই বিএনপির সমর্থক। তবে আন্দোলনের সময় ছেলেকে না যাওয়ার জন্য বলেছি। কিন্তু ছেলে আমার কথা কর্ণপাত করেনি। বরং সে বলেছে আমাদের পুরো পরিবার বিএনপি সমর্থক। আমরা শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলনে না গেলে যাবে কে? নিষেধ না শুনে ছেলে সবশেষ সময়ে আন্দোলনে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। তিনি ছেলে হত্যার বিচার দাবী করেন।


