রাখি বন্ধন বা রাখি উৎসব

।। এস ডি সুব্রত।। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায় প্রতি বছর পালিত হয় রাখি বন্ধন বা রাখি উৎসব। শ্রাবন মাসের শুক্লা পক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। হিন্দু ধর্মে ভাই বোনের ভালবাসার প্রতীক এই উৎসব। এই পবিত্র দিনে বোন ভাইকে রাখী বেঁধে দেয় এবং ভাই বোনকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, শুভ সময়ে রাখী বাঁধার অনেক গুরুত্ব রয়েছে। রাখির দিন ভাইদের খুব যত্ন নেওয়া হয়।রাখিবন্ধন উৎসব হল একটি মহাপবিত্র ও সুন্দর সংহতির অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের দ্বারা ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা ও স্নেহের বন্ধনকে দৃঢ় শক্তিশালী ও পুনরুজ্জীবিত করে তোলে।

এই চিরন্তন পবিত্র উৎসব পরিবারের সকল সদস্যদের পাশাপাশি সমাজ তথা সমগ্র মানব জাতিকে সুসম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ করে ও ঐক্যকে নিশ্চিত করে। রাখিবন্ধন অনুষ্ঠানে ভাইদের পাশাপাশি বোনরা নতুন পোশাক পরিধান করে এবং মিষ্টি মুখ করানোর মধ্য দিয়ে ভাইদের হাতে পবিত্র সুতো বা রাখি বেঁধে দেয়। পরিবর্তে ভাইরা বোনদেরকে উপহার দিয়ে থাকে। ‘রাখিবন্ধন’ বা ‘রাখিপূর্ণিমা’ ভারতের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি সুপ্রচলিত পবিত্র উৎসব। প্রধানত এই দিনে ভাই-বোনের সম্পর্ক আজীবন রক্ষা করার উদ্দেশ্যে দাদা বা ভাইয়ের ডান হাতের কব্জিতে দিদি বা বোনেরা পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। এর মাধ্যমে দিদি বা বোনেরা, দাদা বা ভাইয়ের মঙ্গল কামনা করে থাকে।

হিন্দু পঞ্জিকা মতে শ্রাবন মাসের শুক্লা পক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, রাখি বাঁধার সময় ভাইয়ের মুখ পূর্ব দিকে এবং বোনের মুখ পশ্চিম দিকে হওয়া উচিত। বোনেরা তাঁদের ভাইকে চাল সিঁদুরের টিকা লাগান। ঘিয়ের প্রদীপ দিয়ে আরতি করেন, তারপর মিষ্টি খাওয়ানোর পর ভাইয়ের ডান হাতের কব্জিতে রাখি বেঁধে দেন। রাখিবন্ধন উৎসবের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে মহাভারতের কাহিনী জানা যায় । মহাভারতে বর্ণিত, এক যুদ্ধে কৃষ্ণের কবজিতে আঘাত লেগে রক্তপাত শুরু হলে পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। ফলতু দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয়া হলেও, তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোনের মর্যাদা দেন। পরবর্তীতে কৌরব পক্ষ কতৃক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ কালে শ্রীকৃষ্ণ দৌপদী সম্মান রক্ষা করে ভাই-বোনের সম্পর্ককে দৃষ্টান্ত স্বরূপ গড়ে তোলে, এইভাবেই রাখি বন্ধনের প্রচলন হয়। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছালে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেন বাংলাকে দুটি প্রদেশে বিভক্ত করবে। ফলতু তৎকালীন সময় দেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা চরম আকার ধারন করে।

ব্রিটিশ সরকারের এই বিরূপ সিদ্ধান্ত বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন হিন্দু ও মুসলিম ভাই ও বোনকে একতা হওয়ার আহ্বান করেছিলেন। ১৯০৫ সালের জুন মাসে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে ওই বছরেরই আগস্ট মাসে বঙ্গভঙ্গ জন্য আইন পাশ করায় এবং আইনটি ১৯০৫ সালের ১৬ ই অক্টোবর কার্যকর হলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বোধ জাগিয়ে তোলা এবং ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করার জন্য আহ্বান করেন। রাখি বন্ধন বা রাখি উৎসব যুগ যুগ ধরে ভাই বোনের অমোঘ ভালবাসার বন্ধন তথা মানুষে মানুষে মৈত্রীর বন্ধন হিসেবে টিকে থাকুক ।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
sdsubrata2022@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম