মোবাইল গেমে শিশু-কিশোরদের আসক্তি আরেক মহামারি

প্রতিকী ছবি।

চাঁদপুর: পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত মোবাইল শিশু-কিশোরদের হাতে চলে যাচ্ছে খুব সহজে। দিতে না চাইলে এবং নিষেধ করলে রাগ ও অভিমান বাড়ে শিশুদের। সন্তানের প্রতি সব পিতা-মাতার দুর্বলতা থাকে এবং এটা স্বাভাবিক। নানা কারণে শিশু-কিশোরদের মোবাইলের প্রতি আকর্ষণও খুব বেশী। এর মূল কারণ হচ্ছে মোবাইল ফোনে গেম। এসব গেম খেলার জন্য প্রয়োজন হয় ইন্টারনেট। মোবাইলে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে সম্প্রতি সময়ে। অর্থাৎ করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে পড়া-শুনা করতে গিয়ে আরো বেশী ব্যবহারের সুযোগ পায় শিশুরা। সেই সুযোগে শিশুরা অন্য শিশুদের মাধ্যমে জেনে যায় ইন্টারনেটে গেম খেলার পদ্ধতি। গেম খেলার আসক্তি ছড়িয়ে পড়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে। এখন এই গেম খেলা শিশুদের মধ্যে আরেক মহামারিতে পরিণত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, অধিকাংশ শিশু-কিশোর মোবাইল ফোনে ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেম খেলে। স্মার্ট ফোনে এসব গেম খেলার জন্য উপযুক্ত। অনলাইনে ক্লাশ করার জন্য একই স্মার্ট ফোন ব্যবহার হচ্ছে। মোবাইল গেম খেলার জন্য শহরের শিশুদের আসক্তি শুরু হলে এখন শহর ও গ্রাম সব শিশুদের একই অবস্থা।

গনমাধ্যমের খবরে জানাগেছে, মোবাইল গেমে আসক্তিতে চাঁদপুরের মতলব ও হাইমচরে দুই শিশু-কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালের ২১ মে শুক্রবার মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদি গ্রামে মামুন (১৪) নামে কিশোর ফ্রি ফায়ার গেম খেলার জন্য মোবাইল এমবি কেনার টাকা না দেয়ায় আত্মহনন করেন। চলতি বছর ও মাসের ১৯ তারিখে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী ইউনিয়নে মোবাইল গেমে আসক্ত জনি গাজী (১৫) নামে কিশোর গাছের সাথে উড়না পেচিয়ে আত্মহনন করে। ওইদিন সকালে ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ পাড়া বগুলা গ্রামো গাজী বাড়ীর খাল পাড়ে এই ঘটনা ঘটে। জনি ওই বাড়ীর জেলে দেলোয়ার গাজীর ছেলে।

এ বিষয়ে শিক্ষকদের পরামর্শ হচ্ছে-শিক্ষার্থীরা যাতে মোবাইল গেমে আসক্ত হতে না পারে সেজন্য অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। মোবাইলে শিক্ষণীয় বিষয় দেখার তাগিদ দিতে হবে। বাসায় পড়াশুনার বিষয়ে অভিভাবকদের আরও কঠোর হতে হবে। আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

এছাড়াও নিম্নের ৭টি বিষয় অবলম্বন করতে পারেন অভিভাবকরা:

১. একা থাকার সময় কমিয়ে দিন : বাচ্চা যদি একা একা থাকে তবে সে বেশি সময় ধরে গেমসের প্রতি মন দেবে। কিন্তু গেমস খেলার সময়ে যদি পরিবারের অন্যরাও তার আশেপাশে থাকে, তবে সে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে না এবং একটু একটু করে খেলার প্রতি বিরক্তি এসে যাবে।

২. পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখুন : অনেক গেমস আছে যেখানে বাচ্চারা আপনার ফোন ব্যবহার করে গেমসের বিভিন্ন পয়েন্ট কিনতে পারে। এ কাজটি যেন তারা না করতে পারে তা নিশ্চিত করতে পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখুন। খেলার এসব পয়েন্ট কিনতে না পারলে গেমসের প্রতি বাচ্চার আকর্ষণ কমে আসবে।

৩. সময় বেঁধে দিন : বাচ্চারা যখন একটা গেমস নিয়ে পড়ে আছে, তখন তাকে সময় বেঁধে দিন। কতক্ষণ সে গেমসটা খেলতে পারবে, এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিন। যেমন রাতের খাবারের আগে ১০ মিনিট খেলতে পারবে, এমন নিয়ম করে দিন। এতে তার আসক্তি কমে আসবে।

৪. বেশি সমস্যা হলে কঠোর হন : মনে রাখবেন আপনি তার অভিভাবক এবং আপনার কথাই তার মেনে চলতে হবে। সুতরাং যদি দেখেন বাচ্চা গেমসে বেশি আসক্ত হয়ে গেছে এবং আপনার কোনো নিয়মই মানতে চাইছে না, তাহলে অবশ্যই ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করতে হবে।

৫. অন্য কোনো দিকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে নিন :বাচ্চাদের অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত রাখলে তারা আর গেমস নিয়ে ভাবার সময়ই পাবে না। সে গেমস খেলছে বিরক্তি দূর করার জন্য। আপনি যদি শুধুই তার থেকে ফোন নিয়ে নেন এবং তার করার মতো আর কিছু না থাকে তবে খুব একটা লাভ হবে না। তাদেরকে কোনো একটি খেলা (ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, সাইকেল, সাঁতার, মার্শাল আর্টস) বা কোনো শিল্প (গান, নাচ, বাদ্যযন্ত্র, ছবি আঁকা) শেখার ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিন।

৬. উদাহরণ স্থাপন করুন : বাচ্চার বাবা-মা নিজেরাই যদি সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তবে বাচ্চাও অবধারিতভাবে সেই অভ্যাস গ্রহণ করবে। সুতরাং বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাতে হলে মোবাইল ফোন বা স্মার্টফোন নামিয়ে রাখুন।

৭. নিজের আচরণ ঠিক করুন : আপনি নিজেই কি দায়ী বাচ্চার এই আসক্তির জন্য? ভেবে দেখুন। অনেক অভিভাবক বাচ্চাকে সময় দিতে চান না। বাচ্চা যখন তাদের সাথে খেলতে চায়, তখন তারা বিরক্ত হয়ে বাচ্চার হাতে ফোন ধরিয়ে দেন। এই কাজটা করা থেকে বিরত থাকুন। বাচ্চাকে সময় দিন। এতে আপনার এবং বাচ্চার, উভয়েরই উপকার হবে।
ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম