মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের সিএ টিপুর অত্যাচারে অতিষ্ঠ আপন দুই ভাইয়ের পরিবার

মো. শফিকুর রহমান। ছবি: সংগ্রহীত।

চাঁদপুর:  চাঁদপুর শহরের চেয়ারম্যানঘাট দক্ষিণ বিষ্ণুদী শেখ বাড়ির বাসিন্দা মো. শফিকুর রহমান। পরিবারে টিপু নামে তিনি পরিচিত। সরকারি চাকরি করেন তিনি। পেশাগতভাবে সাধারণ মানুষকে কেমন সেবা দেন সেটি জানা না গেলেও নিজ আত্মীয় স্বজনের কাছে তিনি আতঙ্কিত ব্যাক্তি। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। তার অর্থের প্রভাব, অমানসিক অত্যাচার, খারাপ ব্যবহার, হামলা, মারধর ও নানা হয়রানির শিকার পরিবারের সদ্যরা এখন রীতিমত জিম্মি। আপন ভাই ও ভাতিজারা অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভিটে ছাড়া হওয়ার উপক্রম। ইতোমধ্যে তিনি তার প্রাপ্য হিস্যার বেশি জমি নিজ নামে খারিজ করে অন্য শরিকদের ঠকিয়ে একাই জমি দখলের পায়তারা করছেন বলে অভিযোগ। এহেন কর্মকান্ডে ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের নিকট অভিযোগ দিয়ে এবং সামাজিকভাবে বসে সমাধানের চেষ্টা করেও তার হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না। উপরন্তু উনার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেয়ার আপন ভাতিজার নাক ফাটিয়ে দিয়েছেন বলে জানা যায়।

খোঁজ নিয়ে এবং অভিযোগ থেকে জানাগেছে, মরহুম মতিউর রহমান শেখের ৩ ছেলে ও ৫ মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে টিপু ছোট। তিনি চাকরি করেন মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদে ‘সিএ’ পদে। সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িতে আসেন। বাড়িতে আসার সময় প্রতিবারই বড় মাছ, খাসির মাংস, গ্যালন ভরা দুধ, দেশি মুরগি ও বিদেশি ফল নিয়ে ফেরেন। সরকারের তৃতীয় শ্রেনীর একজন কর্মচারী কিভাবে প্রতি সপ্তাহে এত বাজার বাড়িতে আনেন। তার অর্থের উৎস্য কী এই নিয়ে রয়েছে অনেকের প্রশ্ন।

তিনি বাড়িতে পরিবার নিয়ে আলাদা বসবাস করলেও ভাবি, ভাতিজা, ভাতিজিদের সাথে তার টাকার গরমে খারাপ আচরণ করেন। তিনি সরকারি চাকরির প্রভাব খাটিয়ে এবং পরিবারের অন্যান্যরা তাকে সম্মান করায় বিপরীতমুখি আচরণ করেন। ইতোমধ্যে তার হাতে হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন আপন ভাবি ও ভাতিজা। টিপুর এহেন কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে গত ৫ মে চাঁদপুর সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করেছেন তার মেঝো ভাই শাহজাহান শেখের মেয়ে শিউল।

ভুক্তভোগীদের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, টিপু বাড়িতে আসলে প্রায়শই সরাসরি নিজে এবং তার স্ত্রী সালমা বেগমকে নিয়ে পরিবারের অন্যদের সাথে ঝগড়া বিবাদে লীপ্ত হন। ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর রাত অনুমান সাড়ে ৯টায় টিপুর বড় ভাই মৃত ফজলুল শেখের ছেলে শেখ মো. আল-আমিন তাদের একটি মুরগির খামারের পাশে মোটরসাইকেল রাখাকে কেন্দ্র করে সালমা বেগম রড দিয়ে আল-আমিনের মা নিলুফা বেগমকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথার মাঝখানে আঘাত করে। পরে তিনি দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন।

শফিকুর রহমান টিপুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পৈত্রিক সম্পত্তি ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট প্রাপ্য অংশের চেয়ে বেশি অংশ শরিক ঠকিয়ে নিজ নামে নাম জারি করেছেন। একই সাথে তিনি গত ১০ মার্চ চার তলা বাড়ি করার জন্য চাঁদপুর পৌরসভায় নকশা অনুমোদনের আবেদন করেন। টিপুর এত টাকা যে চারতলা বাড়ি করা তার জন্য মামুলি ব্যাপার। এই অর্থ উনি কিভাবে আয় করলেন? তিনি কেন বেশি জমি নিজ নামে খারিজ করেছেন এই বিষয়ে তার কাছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গেলে শুরু হয় তার স্টিম রোলার। এক পর্যায়ে তিনি আপন ভাতিজা আল আমিন শেখের নাকে মোবাইল দিয়ে আঘাত করে নাক ফাটিয়ে দেন বলে জানা যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হন আল আমিন সেখানে দুই দিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরেন। এমন তথ্য দিলেন তার মেঝো ভাইয়ের মেয়ে এবং বড় ভাইয়ের ছেলে আল আমিন শেখ। ক্ষোভ প্রকাশ করে মেঝো ভাইয়ের মেয়ে ভুক্তভোগী বলেন, তিনি আমার আপন চাচা। কিন্তু তিনি আমার একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়েও নানা অপপ্রচার চালিয়েছেন যা আমার মান হানি করেছে।

টিপুর ভাতিজা আল আমিন শেখ তার মায়ের অনুরোধ দুটি ঘটনায় কোন মামলা করেননি। তবে এসব অত্যাচার ও নির্যাতনের সইতে না পেরে এবং তার সম্মান হানি করায় তার চাচাত বোন থানায় একটি জিডি করেছেন।

শফিকুর রহমান টিপু জেলা পরিষদে সামান্য বেতনের সরকারি চাকরি করলেও তার বিষয়ে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রথম বিয়ে করার সময় যৌতুক গ্রহণ করেন। যৌতুক দেয়ার পরও ওই স্ত্রীকে তিনি তালাক দেন। ওই ঘটনায় মামলা হলে তিনি কারাভোগ করেন। শুধুমাত্র তাই নয়, তিনি যে বেতনভাতা পান তা দিয়ে অনেক সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু তিনি বর্তমান স্ত্রী ও তার নামে শ্বশুর এলাকা বড় শাহতলীতে বাড়ি এবং সম্পত্তির মালিক রয়েছেন। তার স্ত্রীর নামে কিনেছেন সম্পুর্ন একটি বাড়ি। বাড়ির নাম দিয়েছেন সালমা জাহান। সরেজমিন গিয়ে বাড়ির ফলক পাওয়া যায়। প্রযত্নে শফিকুর রহমান, কলেজ রোড, শাহাতলী, চাঁদপুর। বড় শাহাতলীতে তার আরো জমি আছে বলেও জানাগেছে।

আহত আল-আমিন ও তার মা। ছবি: সংগ্রহীত।

এবিষয়ে ভুক্তভোগীরা বলেন, শফিকুর রহমানের কিভাবে এত সম্পদ হয়েছে সে বিষয়ে বর্তমান জেলা পরিষদ, মুন্সিগঞ্জের প্রশাসককে খতিয়ে দেখার অনুরোধ করছি। সরকারের সামান্য কর্মচারি এতকিছুর মালিক কিভাবে হলেন তার সুষ্ঠু তদন্তের জোর দাবী জানাচ্ছি। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বিষয়ে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থা তদন্ত করলে সবকিছু বেরিয়ে আসবে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চাচার অত্যাচারে দুই ভাইয়ের পরিবার ভিটাহীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সেই সাথে টিপু স্থানীয়ভাবে তার শ্যালকের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং নিজের অর্থের জোরে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন।

পারিবারিক এসব বিরোধ সম্পর্কে শেখ বাড়ির কবির শেখ বলেন, শফিকুর রহমান টিপু আমার জেঠাত ভাই। দীর্ঘদিন উনার সাথে আমার কথাবার্তা ছিলো না। তবে উনাদের ভাইদের মধ্যে অতিরিক্ত জমি খারিজ সম্পর্কিত বিষয়ে নিজেদের মধ্যে সমাধান করার জন্য কথা হয়। বিষয়টি বসে সমাধান করার জন্য আমি চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি আমাদের সাথে বসেননি। এছাড়াও উনার বিষয়ে পারিবারিকভাবে মারধরের যেসব অভিযোগ, এগুলো সবই সত্য। তারপরেও এসব বিষয়ে যদি টিপু শেখ সামাজিকভাবে বসে সমাধানে এগিয়ে আসেন, তাতেও আমাদের সহযোগিতা থাকবে। আমরা চাই নিজেদের মধ্যে কোন ধরণের বিরোধ না থাকে।

এই বিষয়ে বক্তব্যের জন্য মো. শফিকুর রহমান টিপুর ব্যাক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে কোন ধরণের জবাবও মিলেনি। যে কারণে তার বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়নি।

ফম/এমএমএম/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম