
।। গোলাম কিবরিয়া জীবন।। আজকের এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে বসে ৫০ থেকে ৬০ বছর পূর্বেকার মফস্বল সাংবাদিকতার কথা চিন্তা করলে অনেকের নিকট যেমন হাসি পাবে তেমনি আবার অনেকে অবাক বা হতবাক হবেন।
আমি বাংলাদেশের একটি জেলা শহর থেকে ঢাকা রাজধানীতে পত্রিকার অফিসে ও টেলিভিশনে সংবাদ, ছবি প্রেরণ সংক্রান্ত সেদিনের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমার এই লেখাটি হয়তো অনেকের নিকট মূল্যহীন বা ভালো নাও লাগতে পারে। তবে আমার বিশ্বাষ যারা আমারমত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন তাঁরা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারবেন।
আমি তৎকালিন মহকুমা শহর বর্তমান জেলা শহর চাঁদপুর থেকে দৈনিক ইত্তেফাক এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৭৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত (বিটিভিতে ১৯৮৪ থেকে ২০২২ সাল) দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে তিক্তঅভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত স্মরণ থাকবে। আমার এই দীর্ঘ সময়ে দায়িত্ব পালনকালে যে বাস্তবা অর্জন করেছি তারই কিছু বাস্তব তথ্য এখানে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট তুলে ধরার চেষ্টাা করছি।
সে সময়ে নরমাল সংবাদগুলো আমরা পত্রিকার প্যাডে হাতে লিখে সাধারণ ডাকযোগ খামে করে পাঠাতাম। আর জরুরি সংবাদগুলো টেলিফোন বা টেলিগ্রামে পাঠাতে হতো। সেসময় টেলিফোনগুলো ছিল এনালক সিষ্টেমের। টেলিফোন সেটের ডান দিকের হাতল ঘুরিয়ে এক্সচেঞ্জের অপারেটরকে বলে ঢাকার নম্বার বুক করে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে যদিও সংযোগ পাওয়া যেতো তাও আবার লাইনটি থাকতো অতি লো, আমি যদি বলতাম চাঁদপুর থেকে বলছি টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হতো কী ফরিদপুর, রংপুর থেকে ইত্যাদি। অর্থাৎ এক পৃষ্টার একটি নিউজ পাঠাতে ২৫-৩০ মিনিট বা তারও অধিক সময় রিসিভার কানে নিয়ে বসে থাকতে হতো। অপর দিকে টিএন্ডটি অফিসে গিয়ে টেলিগ্রাম করতে প্রথমে তাদের নির্ধারিত ফরম নিয়ে ইংরেজী কেপিটাল লেটারে নিউজটি লিখে দেয়ার পর অপারেটর টেলিপ্রিন্টারে টরেটক্কা করে অক্ষরগুলো পাঠাতেন তাও আবার কয়েক ঘন্টা বসে থাকতে হতো। অনেক সময় পুরো নিউজটি পাঠাবার পর অপর প্রান্ত থেকে বলা হতো এ্যরোর হয়েছে আবার পাঠান। এইতো হলো নিউজ পাঠানোর কথা। এ সব জরুরি নিউজের ছবি ও ভিডিও পাঠানোর সময় একজন লোক ঠিক করে তাকে ঢাকায় আসা যাওয়ার ভাড়ার টাকা পয়সা দিয়ে হাতে হাতে ছবি ও ভিডিও ক্যাসেট পাঠাতে হতো।
সে সময় অতি জরুরি সংবাদের ছবি এবং ভিডিও প্রেরণের করার জন্য আজকের মতো এতো আধুনিক প্রযুক্তির ক্যামেরা ও ফ্লিম ছিল না। আমার ব্যাবহৃত ইয়াসিকা ও লুবিটাল ক্যামেরায় ১২০ অথবা ৩৫ নম্বার ফ্লিমে ছবি তোলার পর ষ্টুডিওতে গিয়ে ফ্লিমটি প্রথমে ডেভলাপ করে নেগেটিব বের করে তা শুকিয়ে প্রয়োজনীয় ছবিগুলো দেখে সেগুলো প্রিন্ট করে আবার সে ছবি শুকিয়ে ছবির পিছনে ক্যাপসান লিখে খামে ঢুকিয়ে পত্রিকার অফিসে পাঠানো হতো। অপরদিকে টেলিভেশনে ফ্লিম পাঠানো জন্য তখনকার ভিএইচএফ বড় ক্যামারা কাঁদে নিয়ে পুরো নিউজের চিত্রটি ভিডিও করে সেই আস্ত ক্যাসেটিই টিভি সেন্টারে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। অনেক সময় লোক না পেলে নিজেকেই ঢাকায় চলে যেতে হতো। আবার চাঁদপুর থেকে ঢাকা যাবার লঞ্চ বা যাত্রীবাহি বাসে ঢাকায় যাবার কোন পরিচিত লোক পেলে তাকে অনেক বলে কয়ে পত্রিকা ও টিভি সেন্টারে যাওয়ার আসার ভাড়া দিয়ে ছবি ও ক্যাসেট পাঠাতে হয়েছে।
আপনাদের নিশ্চই জানা আছে চাঁদপুর জেলাটি পদ্মা, মেঘনা, ধনাগোদা ও ডাকাতিয়া নদী বেস্টিত। এই চাঁদপুরের মেঘনা, পদ্মা নদীর উপর দিয়েই প্রতিদিন দেশের উত্তর ও দক্ষিনাঞ্চলে শতাধিক যাত্রীবাহি, লঞ্চ,স্টীমারে ২৫ থেকে ৩০ হাজার যাত্রী যাওয়া আসা করে থাকেন। শুস্ক মৌসুমে নদী শান্ত থাকলেও বর্ষা মৌসুমে নদী অশান্ত হয়ে উঠে তার উপর আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেতো নদীপথ হয়ে উঠে বড়ই বেসামাল ও ভয়ংকর।
সরকারি এক হিসাবমতে দেখা যায় ১৯৭০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চাঁদপুরের বড়স্টেশনের মোলহেড বা মেঘনা মোহনা, রাজজারেশ্বর, সফরমালি, চিরারচর, পুরানবাজার, হরিসভা, মতলব উত্তর উপজেলার এখলাছপুর, মোহনপুর, ষাটনল, হাইমচর উপজেলার গাজীপুর, নীলকমল, চরভৈরবী, লক্ষীপুর ইত্যাদি নৌপথে মেঘনা, পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে ৫ শতাধিক যাত্রীবাহি লঞ্চ, কার্গো, বাল্কহেট ইত্যাদি নদীগর্ভে নিমজ্জিত হয়েছে। এর প্রায় ৭০ ভাগ দুর্ঘটনা হয়েছে চাঁদপুরের উল্লেখিত স্থান সমূহে। এসব দুর্ঘটনায় ৫ সহস্রাধিক যাত্রীকে প্রাণহারাতে হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ৬ হাজার অধিক যাত্রীকে। এসব দুর্ঘটনা হবার পর কর্তৃপক্ষ প্রতিবারই নামমাত্র একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সকল দায়িত্ব এড়িয়ে যান। তাই স্বজনহারা লোকদের বুকফাটা কান্না আজও তাদের কানে পৌঁছায় নাই। ফলে প্রায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে আর শতাধিক প্রাণহানীর ঘটনা ঘটছে।
আমার এই দীর্ঘ সাংবাদিকতার জীবনে সবচেয়ে বেশি মানসিক যন্ত্রনা, টেনশন এবং অক্লন্ত পরিশ্রম দিয়েছে এ সব নৌযান দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনাগুলোতে। এসব দুর্ঘটনার সংবাদ ও ছবি সংগ্রহ করার জন্য উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ট্রলার বা স্পীড বোট নিয়ে মেঘনা, পদ্মা নদীর মাঝে দুর্ঘটনা স্থলে গিয়ে ছবিতোলা, ভিডিও করা যে কত দুরহ ও কষ্টসাধ্য তা লিখে বুঝানো যাবে না। আবার এসব ছবির ফ্লিম ও ভিডিও ক্যাসেটসহ দ্রুত নিউজটি হাতে লিখে ঢাকাগামী লঞ্চে লোকদিয়ে পাঠাতে হতো। সময়মত নিউজটি প্রকাশ ও প্রচার করার জন্য বহুবার নৌ পুলিশের সাহায্য নিয়ে চাঁদপুর থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ থামিয়ে সেই লঞ্চের মাষ্টার বা কোন পরিচিত লোকের নিকট এসব নিউজ ক্যাসেট ও ফ্লিম পাঠিয়েছি। কারণ সে সময়ে আজকের মত এতো অত্যাধুনিক লেফটপ, মোবাইল বা নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা কিংবা সংযোগ ছিল না।
আমার যতদূর মনেপড়ে চাঁদপুরের মোহনায় এমভি দীনারে প্রায় ২শত, এমভি নাছরিনে ৩ শতাধিক, এখলাছপুরে এমভি সালাউদ্দিন লঞ্চে ৩৬৩ জন যাত্রী প্রাণ হারায়। এ ছাড়া নাম মনে না পড়া আরও ২ শতাধিক যাত্রীবাহী লঞ্চ, কার্গো ট্রলার ডুবির ঘটনায় কয়েকশত যাত্রী ও লঞ্চের কর্মচারীর প্রাণহানি হয়েছে।
আমার সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় নৌপথ, স্থলপথ ও রেলওয়ে পথে, বহু ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছি। যা কোন দিন ভুলারমত নয়। এসব ঘটনার কাহিনী বর্ননা করতে গেলে বহু সময় লেগে যাবে। তাই এখানে সংক্ষেপে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা বর্ননা করার চেষ্টা করছি।
এম ভি সালাউদ্দিন যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবির ঘটনায় আমার কয়েকটি কথা মনে পড়েগেছে যা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজ মনে করছি। এমভি সালাউদ্দিন লঞ্চটি যে সময় মেঘনাগর্ভে নিমজ্জিত হয়, সেসময় আমি ঢাকার আগারগায়ে এলজিইডির অডিটোরিয়ামে বিটিভির একটি সম্মেলনে ছিলাম। সে সময় প্রচন্ড ঝড়ের গতি দেখেই আমার মনে হয়েছিল আজ আবার কোন দুর্ঘটনার খবর না আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার বড় বোনের যাত্রাবাড়ির বাসায় এসে পৌছারপর রাত সাড়ে ১১ টার সময় চাঁদপুর থেকে ছোটভাই টেলিফোনে জানায় ষাটলনে লঞ্চ মেঘনায় ডুবে গেছে এবং ৩ শতাধিক যাত্রি মারা গেছে।
এই খবর পাবার পর আমার রাতের ঘুম শেষ হয়েগেছে। আমার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা আমি কখন ঘটনাস্থলে যাবো এবং নিউজ সংগ্রহ করবো। তাই ফজর নামাজ পড়েই ভোরে সদরঘাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই এবং চাঁদপুরগামি প্রথম লঞ্চে উঠি। লঞ্চে উঠেই লঞ্চের মাষ্টার বা সারেংকে বলে রাখি আমি ষাটনল লঞ্চডুবির ঘটনাস্থলে নামবো আমাকে দয়া করে ওখানে নামিয়ে দেয়ার জন্য। কারণ ষাটনলের ওই স্থানে লঞ্চ থামাবার কোন নিয়ম ছিল না। সারেং সাহেবকে অনেক ধন্যবাদ সেদিন তিনি আমাকে ঘটনাস্থলে লঞ্চ থামিয়ে একটি মাছ ধরার নৌকায় নামিয়ে দিয়েছিলেন। নৌকায় করে আমি পাড়ে এসে পৌঁছার কিছুক্ষনপরই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, চাঁদপুরের ডিসি, এসপি ঘটনাস্থলে আসেন।
উদ্ধারকারি জাহাজ ‘রুস্তম’ ও ‘হামজা’ রাতেই নারায়নগজ্ঞ থেকে ষাটনলে এসে পৌছায়। সকাল সাড়ে ১১টার সময় যখন ডুবুরিরা নিমজ্জিত লঞ্চের লোকেশান সঠিক করতে থাকে তখনই পর পর ৫টি মৃতদেহ ভেসে উঠে। আমি যেহেতু ঢাকা থেকে গেছি তাই আমার নিকট কোন ক্যামেরা বা ভিডিও ছিল না তাই বাধ্যহয়ে আমি আমাদের ইত্তেফাকের মতলব(উত্তর) প্রতিনিধি সামছুজ্জামান ডলারের স্মরণাপন্ন হই। ডলার ছেঙ্গারচর বাজারে গিয়ে একটি ভিডিও দোকান থেকে ক্যামেরা জোগারকরে আমার নিকট নিয়ে আসে এবং আমাকে এক ঘন্টার সময় দিয়ে বলে এই ক্যামেরা একটি বিয়ে বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান ভিডিও করার জন্য আগে থেকেই বায়না হয়ে আছে। তাই আমি সময়মত প্রয়োজনীয় সকল বিডিও সম্পন্ন করে ক্যাসেটটি খুলে রেখে ক্যামেরা দিয়েদিই। ধন্যবাদ দিই ডলারকে এই সহযোগিতা করার জন্য। পরে এই ক্যাসেট নিয়ে মোহনপুর নৌপুলিশের সহায়তায় চাঁদপুর হতে ঢাকাগামী একটি লঞ্চ থামিয়ে তাতে উঠে লঞ্চে বসেই সমস্ত নিউজ লিখে বিটিভিতে ও ইত্তেফাকে পৌছে দেই। আবার সন্ধ্যার লঞ্চে করে চাঁদপুর যাত্রা করি। রাত প্রায় ১২ টার সময় চাঁদপুরের বাসায় পৌছি। পরদিন বাসা থেকে আমার ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে সকাল ৯টায় আবার চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে এসে নারায়নগঞ্জের লঞ্চ ধরে সাড়ে ১১টা নাগাদ ষাটনলে গিয়ে পৌছি। এ সময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যে উপস্থিত সকলকে কান্না করতে দেখা যায়। কারণ ওই সময় নিমজ্জিত লঞ্চটি মেঘনার তলদেশ থেকে উপরে উঠাবার জন্য টান দিলে লঞ্চের খোলের ভিতর থেকে ৩০-৩৫ টি নারী পুরুষের লাশ বের হয়ে আসে। এসব লাশের কয়েকটি তাদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিয়ে যান আর অধিকাংশ লাশই বেওয়ারিশ হিসাবে ষাটনলে মেঘনাপাড়ে এলজিইডি কর্তৃক নির্মিত নৌপর্যটন কেন্দ্রের পাশে খোলাস্থানে মাটি দেয়া হয়। আশা করি সম্মানীয় পাঠকদের এসব ঘটনাগুলোর বর্ননায় ধর্য্যচ্যুতি হবে না।
হাজীগঞ্জ উপজেলার কংগাইস নামক স্থানে এক সময় চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রামগ্রামী মেঘনা এক্্রপ্রেস ট্রেন ভোরে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শিকার হয় এতে ইঞ্জিনসহ ৪টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ৫ যাত্রী প্রাণ হারায় এবং প্রায় ৩০-৩৫ জন যাত্রী কমবেশী আহত হন। ট্রেনের একটি বগি আরেকটি বগির উপর উঠে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দুর্ঘটার সংবাদটি পাঠাবার জন্য আমি প্রয়োজনীয় ছবি তুলে, ভিডিও করে সমস্ত তথ্য নিয়ে পুরো নিউজটি লিখে তৈরী করে চিন্তা করছি কী করে ঢাকায় পত্রিকা ও টিভি অফিসে পাঠাবো। কারণ তখন সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন বা হরতাল চলছিল। তাই বাধ্যহয়ে পুলিশ সুপারের নিকট বিস্তারিত বলে ওনার সহযোগিতায় একজন কনস্টেবলকে নিয়ে একটি মাইক্রো ভাড়া করে অন্যান্য সহকর্মীদের সংবাদ ও ছবি নিয়ে সন্ধ্যার পূর্বে ঢাকা পৌছে যথাস্থানে সংবাদের খামগুলো পৌছে দেই। চাঁদপুর থেকে ঢাকা যাবার পথে চান্দিনা, গৌরীপুর, কাচপুর ও,যাত্রাবাড়িতে হরতালকারীরা আমাদের গাড়ী আটক করে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে তখন গাড়ীতে থাকা পুলিশের সহয়তায় ছাড়াপেয়ে যাই। পরদিন এই সংবাদটি প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছবিসহ প্রকাশ করা হয়।
মতলব উত্তরের ঋষিকান্দি নামক এলাকায় একবার ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে এতে প্রায় ৩০টি ঋষি পরিবারকে তাদের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের ঘরবাড়ি লুটপাট,ভাংচুর ও গাছগাছালি কেটে পুরো ঋষি পাড়ার ভিটামাটি চাষ করে ক্ষেত অর্থাৎ বিরাণভূমি বানিয়ে দেয়া হয়। আর এই কাজে নেতৃত্বদেন এলাকার কিছু প্রভাভশালী ব্যক্তি এতে জোগদেয় মতলব থানাসহ পাশবর্তী কচুয়া ও দাউদকান্দি থানার কয়েকশত লোকজন। আগত লোকদের আক্রমনের মুখে ভয়ে ও আতংকে ঋষি পরিবারগুলোর প্রায় ২শত নারী পুরুষ এবং সন্তানরা তিনদিন জাবৎ তাদের ভিটামাটি ছেড়ে বনে জঙ্গলে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বা যে যেখানে সুযোগ পেয়েছে সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিল। এই সংবাদটি আমি এবং আমার দুই সহকর্মী সন্ধ্যা ৮টার সময় চাঁদপুরের অতিপরিচিত মিষ্টির দোকান ‘ওয়ান মিনিটে’ বসে চা নাস্তা খাবার সময় পিছন থেকে ৩ জন ঋষির কান্নাকরা কন্ঠে বলাবলি করার সময় জানতে পারি। পরে আমি এবং আমার এক সহকর্মী একজন সরকারী কর্মকর্তার একটি জিপগাড়ি নিয়ে রাত প্রায় ১১টার সময় মতলব দক্ষিন থানায় পৌছি। সেখানে চাঁদপুরের এসডিপিও ( সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার) ওসির বাসায় ঘুমাচ্ছিলেন। তখন ওনাকে ঘুম থেকে ডেকে উঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জেনে রাতে মতলবেই পরিচিত এক আআত্মীয়ের বাসায় বাকি রাত অপেক্ষা ভোরে লঞ্চযোগে ঋষিকান্দি পৌছি।
সেখানে গিয়ে দেখি পুরোভিটা খালি, মনে হলো কেউ হালচাষ করে রেখেছে। আমি আমার ক্যামেরায় কাটাগাছ, চাষ করে রাখা ভিটার ছবি তুলছিলাম এমন সময় দেখি ঋষি পরিবারের কয়েকজন মহিলা মাথায় কীযেন নিয়ে এদিকে আসছে। পরে তাদের নিকট ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারি। এই সংবাদটি চাঁদপুরে আসার পর দ্রুত প্যাডে লিখে পুরো ফ্লিমের রোলটি ডেভলাপ না করে আমার ছোট ভাইকে দিয়ে পত্রিকার অফিসে পাঠিয়ে দেই। পরদিন সংবাটি শুধুমাত্র দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। এই সংবাদ ছাপা হবার পর কুমিল্লার তৎকালীন জিওসি (মেজর জেনারেল) চাঁদপুর ও মতলব আসেন। এই সংবাদের জন্য আমাকে একবার কুমিল্লা সামরিক আদালতেও হাজিরা দিতে হয়েছিল।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ না করে পারছিনা, আর তা হলো আমি ঋষিকান্দির এসব অসহায় পরিবারের ঘটনাটি চাঁদপুর এসে তৎকালিন মহকুমা প্রশাসক মোয়াজ্জেম হোসেনকে জানাই। তিনি আমার থেকে সমস্ত ঘটনা শুনার পর চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্সের সহায়তায় অসহায় পরিবারগুলোর জন্য কিছু গুড়া দুধ, কয়েক বস্তা চিড়া, গুড়, অন্যান্য শুকনা খাবার, কিছু আসবাবপত্র এবং কয়েকশ পানির বোতল সংগ্রহ করে দুটি স্পীড বোডে করে আমারা ঋষিকান্দি নিয়ে যাই এবং সেখানে গিয়ে এসডিও সাহেব ঋষিদের নিরাপত্তার সকল প্রকার আশ্বাষ প্রদান করেন। আসলে মহকুমা পুলিশ সুপার সাহেব এসব ঘটনাগুলো তিনদিন যাবৎ মহকুমা প্রশাসক সাহেবকে না জানিয়ে গোপনে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনাটি কারা কেন কী কারণে ঘটিয়েছেন তা সবারই বিশেষ করে মতলববাসীর অবশ্যই জানা আছে। এই ঘটনার আর বিস্তারিত নাইবা উল্লেখ করলাম।
মতলব উত্তরে মেঘনা নদীর পশ্চিমপাড়ে চরকাশিম ও ছষ্ঠখন্দ বোরোচর দখল নিয়ে পাশবর্তী শরীয়তপুরবাসীর সাথে এক সময় ভয়াবহ সংঘর্ষ সংগঠিত হয়। এতে অগ্নিকান্ড, লুটপাট, বাড়িঘর ভাংচুরে ৫ জন নিহত ও শতাধিক নারী পুরুষ আহত হয়। এই নিউজটিও আমি ছবি তুলে লোক দিয়ে ঢাকা পাঠাই। ইত্তেফাকে নিউজটি ছবিসহ প্রকাশিত হবার পর তৎকালিন প্রেসিডেন্ট হোসাইন মোহাম্মদএরশাদ নিজে ওই চরে যান এবং বিষয়টি মিমাংসা করার জন্য সংশ্লিষ্ট চাঁদপুর ও শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেন এবং ভূমি সচিবকে আহব্বাহয়ক করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।। বর্তমানে চরকাশিম ও বোরোচরটি মতলব উপজেলার এখলাসপুর ইউনিয়নের আওতায় এই এলাকাবাসী ভোগদখল করছেন।
মতলব উত্তর উপজেলার জোড়খালী গ্রামে একরাতে ঘুমের মধ্যে ক্লোরো ফার্ম করে একই পরিবারের ৬ জনকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি আমার কানে আসার সাথে সাথে আমি তৎকালিন জেলা প্রশাসক মোঃ রেজাউল করিম সাহেবের নিকট যাই এবং তাঁর নিকট ঘটনার সত্যতা শুনতে পাই। তিনি বললেন আমি এখনই লাঞ্চ করে ওখানে যাবো। এ কথা শুনে আমি দৌড়ে বাসায় আসি এবং আমার ক্যামেরা নিয়ে ডিসি সাহেবের বাংলোতে আসি এবং ওনার সাথে একত্রে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে স্পীড বোটে জোড়খালী গ্রামে ওই ঘরে ডুকে মৃতদেহগুলো বিছানায় পড়ে থাকতে দেখি। বিস্তারিত ছবি তুলে, ভিডিও করে আমারই একজন সহকর্মীকে দিয়ে নিউজটি পত্রিকার অফিসে ও টিভিতে পাঠাই। যা পরদিন ৩ টি ছবিসহ ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়।
চাঁদপুর-লাকসাম রেললাইনে শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী ও লাকসাম স্টেশনের মাঝে একবার সাগরিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ৫ বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে কমপক্ষে ২৫ যাত্রী আহত হন। ট্রেনের চাকার ঘর্ষণে প্রায় ৫শত মিটার রেললাইন রশিরমত আকাবাকা হয়ে পার্শবর্তী ক্ষেতে পড়ে যায়। এই নিউজটি আমি শুনামাত্র ঘটনাস্থলে ছুটে যাই এবং প্রয়োজনীয় সকল প্রকার ছবি তুলে ও ভিএইচএফ ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করে সংক্ষেপে নিউজটি লিখে টিভি এবং পত্রিকার জন্য খাম দুটি রেডি করে চিন্তা করছিলাম কীকরে এগুলো ঢাকায় পাঠাবো। কারণ ঘটনাস্থল থেকে চাঁদপুরের দূরত্ব প্রায় ৩০ মাইল। চাঁদপুর যেতে যে সময় লাগবে এবং সেখান থেকে লোকদিয়ে ঢাকা পাঠালে কোন অবস্থায়ই সময়মত নিউজ প্রকাশ করা যাবে না। এমন সময় ১৭-১৮ বছরের একটি কিশোর আমার নিকট এসে বলে ভাই আমি আপনার নিউজ ও খাম নিয়ে ঢাকায় যেতে পারবো। তখন মনে একটু আশার আলো দেখলেও চিন্তা লাগলো এই ছেলেকে চিনিনা জানিনা এবং সে কী আদৌ নিউজগুলো নিয়ে ঢাকায় টিভি ও পত্রিকার অফিসে যেতে পারবে? কিন্তু সময়ের কথা চিন্তা করে ওই ছেলেটিকেই ঢাকা পাঠিয়ে দিই। আমি চাঁদপুর এসে টিভি ও পত্রিকার অফিসে ফোন করে জানতে পারি ছেলেটি সঠিক সময়েই নিউজের খামগুলো সংশ্লিষ্ট অফিসে পৌছে দিয়েছে। পরে জানতে পারি ছেলেটির নাম মো: ইউনুস। আজ সে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।
আমাদের সাপ্তাহিক চাঁদপুর পত্রিকার তৎকালীন বার্তা সম্পাদক জনাব কাজী শাহাদাত একদিন সকালে আমার কাছে এসে বলেন হাজীগঞ্জ উপজেলায় ভোরে চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম গামী মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেনটি বিরাট দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে একটি ছোট্ট শিশুর উপস্থিত বুদ্ধির কারণে। তিনি ঘটনাটি বললেন এইভাবে যে, আবুল খায়ের নামের একটি ১০/১১ বছরের শিশু প্রতিদিনের ন্যায় হাঁসের খাবার সংগ্রহের জন্য শামুক কুড়াতে রেল লাইনের পাশে খাল ও বিলের পাড়ে হাটছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ে হাজীগঞ্জ রেল স্টেশনের পূর্বপাশে বড় ব্রিজের নিকট একটি রেল লাইনে ভাংগন দেখা দিয়েছে। ওইদিকে মেঘনা ট্রেনটিও ছাড়ার সময় হয়েগছে। সে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে তার বড় চাচির লাল পেটিকোট এনে একটি লাঠির মাথায় লাগিয়ে লাইনের উপর উড়াতে থাকে। তখন ট্রেনের চালক ভোরের হালকা আলোতে লাল কাপড় দেখে দ্রুত ট্রেনটি থামায় এবং ট্রেন থেকে চালকসহ যাত্রীরা নেমে এই ঘটনাটি দেখার পর ওই শিশুটিকে কিছু নগদ টাকা পয়সা উপহার স্বরুপ দান করে। ৩ ঘন্টা পর লাইনটি ঠিক করে মেঘনা আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। এটি শুনার পর আমি শাহাদাতকে নিয়ে বাসে করে দ্রুত হাজীগঞ্জ রেল স্টেশনে যাই এবং স্টেশন মাষ্টারের নিকট থেকে সমস্ত বিষয় জেনে খায়েরের বাড়ি, ঘটনাস্থলে যাই কিন্তু তখন খায়ের বাড়িতে ছিল না, সে তার বাবার সাথে হাজীগঞ্জ বাজারে একটি নতুন জামা কিনতে গিয়েছিল। আমরা লোক পাঠিয়ে খায়েরকে বাজার থেকে ডেকে এনে স্টেশনে নিয়ে আসি এবং তার মুখের কথা ভিডিও করে ঘটনাস্থলে নিয়ে খায়েরকে দিয়ে বর্ননা করে ভিডিও করি। পরে শিশুটির পারিবারিক অবস্থার কথা শুনে আমি তার হাতে একশত টাকার একটি নোট দিয়ে জামা বা পেন্ট কিনে নেয়ার কথা বলে চাঁদপুর এসে দ্রুত নিউজ লিখে ও ছবি প্রিন্ট করে ঢাকায় নিউজ ও ছবি পাঠাই। পরে অবশ্য এই খায়েরকে নিয়ে বহু টিভি, পত্রিকা বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করে এবং বানিজ্যিক ফয়দা লুটে। সে লাইনে আর নাইবা বললাম।
চাঁদপুরের বাবুরহাট ও আশিকাটি এলাকায় একবার জায়গাজমি দখলকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ সংগঠিত হয়। এতে শিশুসহ ২ জন নিহত এবং প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি আহত হয়। আক্রমনকারীদের হামলায় ১৫-২০ টি বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট হয়। আমার পাঠানো এই নিউজটি ইত্তেফাকে প্রকাশিত হবার পর একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে ঢাকা প্রেস কাউন্সিলে মামলা করে। প্রেস কাউন্সিলে আমি আমার নিউজের স্বপক্ষে সমস্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় প্রমানাধি দাখিল করার পর প্রেস কাউন্সিলের মাননীয় চেয়ারম্যান ও জুরিমন্ডলী মামলাটি খারিজ করে দেন এবং আমার তথ্য ও প্রমানাদি দেখে আমাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
চাঁদপুর জেলায় এক সময় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির যোগশাজসে ব্যাপক দুর্নীতি চলছিল। যার ফলে সাধারণ শিক্ষকগন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সমিতির নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হুমকি ও চাপেরমুখে তারা প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছিলেন না। আমি প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমানাধি সংগ্রহ করে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত ’সাপ্তাহিক চাঁদপুরে’ সিরিজ আকারে এবং দৈনিক ইত্তেফাকে এই দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করি। এই সংবাদ প্রকাশ হবার পর মন্ত্রণালয় থেকে এক আদেশ বলে একদিনের মধ্যেই চাঁদপুরা জেলা শিক্ষা অফিসারসহ ৫জন উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে অন্যত্র বদলি করা হয়। আর মন্ত্রণালয়ে চাঁদপুর জেলাকে অলিখিতভাবে রেড জোন ঘোষণা করা হয়। এতে চাঁদপুরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা বিরাট পরিবর্তন আসে আর ক্ষতিগ্রস্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সমিতির নেতাগণ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশক, সম্পাদক ও আমার বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানির মামলা করার জন্য উকিল নোটিশ পাঠায়। আমি ইত্তেফাকে গিয়ে আমার বড় ভাই তৎকালিন চীফ রিপোর্টার মরহুম জাকারিয়া মিলন এবং সিনিয়র রিপোর্টার মরহুম নাজিম উদ্দিন মোস্তান ভাইয়ের সহায়তায় ইত্তেফাকের আইনজীবীর সাথে আলাপ করে আমার সংগ্রহীত সকল তথ্য ও প্রমানাধি উস্থাপন করার পর আইনজীবী ওই নোটিশের জবাব দেন। এর কয়েকমাস পর দেখি চাঁদপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মাঠে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির এক সমাবেশে একজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতে এই মামলা তুলে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।
চাঁদপুরবাসীর চিরদিনের দু:খ মেঘনা, পদ্মা নদীর ভাঙন। তার উপর রয়েছে মেঘনা ধনাগোদা ও ডাকাতিয়া নদীর ভাঙন। যেহেতু চাঁদপুর জেলাটি ৪টি নদী বেষ্টিত তাই প্রতি বছর এসব নদীর ভাঙনে বহু পরিবার তাদের ভিটামাটি হারিয়ে ছিন্নমূল হয়ে পড়ছে। চাঁদপুর জেলার মতলবরে ষাটনল থেকে চাঁদপুর হয়ে হাইমচর উপজেলার চরবৈরভী পর্যন্ত প্রায় ৬০ মাইল দীর্ঘ নদী প্রতি বছরই কমবেশী ভাঙছে। তবে ১৯৭০ সাল থেকে চাঁদপুর শহরের পুরান বাজার ও নতুন বাজারে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। মাত্র কয়েক মাসের ভাঙনে পুরাণবাজার বাণিজ্য কেন্দ্রের কয়েকশত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বহুতল ভবনাদি মেঘনা গর্বে বিলীন হয়ে যায়।
এসময় নিরুপায় হয়ে পুরাণবাজারের ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকরা জেনেভায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে নদী ভাঙনের বিষয় কথা বলেন। তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ৩ জন মন্ত্রী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ উর্ধŸতন কর্মকর্তাগণ মেঘনার ভাংগন পরিদর্শন করতে চাঁদপুর আসেন এবং জরুরি ভিত্তিতে সাড়ে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে যান। পরবর্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু চাঁদপুর আসেন এবং বড়স্টেশনের এক জনসভায় চাঁদপুর শহরটিকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করার জন্য প্রাথমিকভাবে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়ে যান। কিন্তু প্রতিবছরই এই বরাদ্দের নামমাত্র থোক বরাদ্দ দেয়া হত। অর্থাৎ যখনই যেখানে ভাঙন দেখা দিতো সেখানেই কোন রকমভাবে জোড়াতালি দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হতো। ফলে ভাঙনরোধের নামে চলতো প্রহশন। চাঁদপুরবাসীর পক্ষ থেকে ভাঙন রোধকল্পে যতই দীর্ঘ মেয়াদী এবং স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহন করার দাবী করা হতো তা কখনই বাস্তবায়ন করা হতো না। ফলে এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নতুন ও পুরাণবাজারের কয়েক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও বেশকিছু গুরুত্¦পূর্ন স্থাপনাসহ কয়েক মাইল নদীতীর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রায় আড়াইশত বছরের পুরানো চাঁদপুর রেলস্টেশন, স্টীমারঘাট, লঞ্চটার্মিনালসহ পুরো এলাকাটি মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘন্টার ব্যবধানে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর প্রবল স্রোতেড় তোড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
অপর দিকে হাইমচর উপজেলায় কোন প্রকার নদীরক্ষা বাঁধ না দেওয়ার ফলে ৯০ এর দশকে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই উপজেলায় প্রায় ২ শতবছরের পুরানো একটি বিশাল বাজার, ২টি সরকারি হাই স্কুল, প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, উপজেলা পরিষদ ভবন, থানা ভবন, উপজেলা খাদ্যগুদাম, ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, বেশ কয়েটি মাদ্রাসা ও মসজিদ, মন্দির, গুরুত্বপূর্ন স্থাপনাসহ কয়েকশত পরিবারের ভিটামাটিসহ প্রায় আড়াই মাইল মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এসব সংবাদগুলো আমি নিজে বা কখনও লোকদিয়ে পত্রিকাও টিভি অফিসে পাঠিয়েছি। কথায় বলে আগুন লাগলে ভিটিটা থাকে কিন্তু নদী ভাংগলে কিছুই থাকে না।
হাইমচরে আমার জানামতে এমন অনেক পরিবার আছে যাদের ঘরভিটামাটি প্রমত্তা মেঘনার ভাংগনে ৬-৭ বার পর্যন্ত নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আজ থেকে ২০-২৫ পূর্বে যারা হাইমচর উপজেলাটি দেখেছেন তারা হয়তো বলতে পারবেন মেঘনা নদীর ভাঙনে হাইমচরে কী ছিল আর এখন কী আছে। প্রায় আড়াইশত কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের বন্যানিয়ন্ত্রন বাঁধ এই হাইমচরেই ৪ বার নদী ভাঙনের কবলে পতিত হয়েছে। এতে প্রতিবছরই কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে নতুন করে বাঁধনির্মাণ করতে হয়েছে। ৯০ এর দশকে এমন সময়ও গেছে যে প্রায় প্রতিদিনই কয়েকটি ছবি এবং ভিডিও পত্রিকা আর টিভি অফিসে পাঠাতে হয়েছে।
ছিন্নমূল অসহায় হাইমচর ও চাঁদপুরবাসীর আবেদন নিবেদন এবং বাস্তবতা উপলদ্ধিকরে পরে অবশ্য শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর চাঁদপুরের নদী ভাঙনের উপর গুরুত্বদিয়ে চাঁদপুর শহর ও হাইমচর উপজেলা রক্ষাকল্পে চাঁদপুর টু হাইমচর পর্যন্ত নদীতীর সংরক্ষন করার জন্য জিইও ব্যাগভর্তি বালি এবং সিসি ব্লক বাঁধ দেয়ার জন্য সাড়ে ৭ শতকোটি টাকার একটি স্থায়ী এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহন করে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম পর্বে সাড়ে ৩ শত কোটি টাকার কাজ শুরু করার সুফল হিসাবে নদী ভাঙন কিছুটা রোধ হয় এবং চাঁদপুর ও হাইমচরবাসীর মধ্যে স্বস্থি ফিরে আসে এবং এই সমস্যা থেকে অনেকটা সমাধান পেতে শুরু করেন। এছাড়া বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানীর ঘটনাতো প্রায়ই লোকদিয়ে নিউজ ভিডিও পাঠাতে হতো। তা নাইবা বর্ননা করলাম। যেহেতু আমি বাংলাদেশ টেলিভিশন এর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম তাই সরকারের মন্ত্রী, এমপি, সরকারি পদস্থ আমলাদের নিউজ কভারেজ করার জন্য সব সময় জরুরি ভিত্তিতে নিউজ ও ভিডিও পাঠাতে হয়েছে। এসব নিউজ অনেক সময় মন্ত্রী এমপিদের পিআরও-এর সহায়তায় ভিডিও ক্যাসেট ও নিউজ পাঠাতে হয়েছে।
এসব কাহিনী ও আমার অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গেলে প্রচুর সময় লেগে যাবে। আমি আমার এই লিখার শুরুতেই বলেছি বর্তমান আধুনিক কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-মেইল, অত্যাআধুনিক মোবাইল এবং আইফোন আজ থেকে ২৫/৩০ বছর পূর্বে ছিল না। তাই আমারমত মফস্বল সাংবাদিকদের এনালগ ল্যান্ডফোন, টরেটক্কা টেলিগ্রাম এবং হাতে লিখে লোক মারফত সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে সংবাদ, ছবি ও ভিডিও পাঠানো ছাড়া বিকল্প কোন ব্যবস্থা ছিল না। অবশ্য ’১৯-এর দশকের শেষ ভাগে এসে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলা ইন্টারনেটের আওতায় আওতাভূক্ত হলে এর কিছুটা সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। কিন্তু চাঁদপুর শহরে অপটিক্যাল লাইন অনেক পরে সংযোগ দেয়া হয়। তাই এসময় কতিপয় ব্যবসায়ী তাদের দোতলা তিন তলা ভবনের ছাদের উপর উচু উচু এনটিনা (টাওয়ার) লাগিয়ে নেট সংযোগ করে বানিজ্যকভাবে নেটের কাজ করতেন। আর আমরা সাংবাদিকরা ওইসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে সংবাদ ছবি পাঠাতাম। আস্তে আস্তে ’২০ এর দশকে মোটামোটি প্রায় সকল সুযোগ সুবিধাই হাতের কাছে আসতে শুরু করে।
তখন অনেকটা ঘরে নিউজ, ফুটেজ ও ছবি ল্যাবটবে ইন্টারনেটের সাহায্যে প্রেরণ করার সুযোগ পেতে শুরু করি। আর এখনতো একটা ভালো মোবাইল আর তাতে নেট সংযোগ থাকলে একই মোবালেই ভিডিও, ছবি তুলে নিউজ টাইপ করে তা এডিট করে ঘটনা স্থল থেকে সাথে সাথে টিভি, পত্রিকার অফিসে পাঠিয়ে দেয়া যাচ্ছে। কাজেই এসব সুযোগ সুবিধা যাদের এখন হাতের মুঠোও তারাতো স্বাভাবিকভাবেই ২৫ থেকে ৩০ বছর আগেকার নিউজ সংগ্রহ করা ও প্রেরণ সংক্রান্ত উল্লেখিত সমস্যা সমূহের কথা চিন্তা করতে পারবেন না।
লিখেছেন: গোলাম কিবরিয়া জীবন, সাবেক সভাপতি, চাঁদপুর প্রেস ক্লাব।
বর্তমান ঠিকানা: জামাইকা, নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬খ্রি.


