ভাইরাল হওয়ার নেশা, তরুণ প্রজন্মের নতুন আসক্তি

মোঃ মহসিন হোসাইন।

ভূমিকা: একবিংশ শতাব্দীকে বলা হচ্ছে প্রযুক্তি আর তথ্যপ্রবাহের যুগ। এই যুগে খ্যাতি আর সাফল্যের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। একসময় খ্যাতি অর্জন মানে ছিল দীর্ঘ সময় ধরে মঞ্চ, সাহিত্য, রাজনীতি বা খেলাধুলার মতো ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করা। এখন আর সেই অপেক্ষা করতে হয় না। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে একটি মাত্র ছবি, ছোট ভিডিও বা লাইভ স্ট্রিমের মাধ্যমেই রাতারাতি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে উঠতে পারে “তারকা”। এই সহজ খ্যাতি অর্জনের প্রবল আকাক্সক্ষাই আজ তরুণ সমাজকে এক নতুন আসক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে ভাইরাল হওয়ার নেশা।

অনলাইন খ্যাতির ঝলক ও আকর্ষণ: 
ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন হাতে পাওয়ায় আজকের তরুণরা প্রতিনিয়ত সংযুক্ত থাকে ভার্চুয়াল জগতে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে তারা নিজেদের প্রতিভা, সৃজনশীলতা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রতম মুহূর্তও শেয়ার করছে। এর মধ্যে কিছু ভিডিও বা পোস্ট মুহূর্তেই লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। মানুষ মন্তব্য করে, লাইক-শেয়ার দেয়, অনেকে অনুসরণ করতে শুরু করে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয় এক ধরণের খ্যাতির স্বাদ। সমস্যা হলো, এই খ্যাতি যত দ্রুত আসে, তত দ্রুত চলে যায়। তবুও সেই ক্ষণস্থায়ী খ্যাতির নেশায় অনেকে বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা ভাবে, “একবার ভাইরাল হতে পারলেই জীবন বদলে যাবে।”

নেশার মতো জনপ্রিয়তা: ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব:
ভাইরাল হওয়ার নেশা এখন এক ধরনের মানসিক আসক্তি। যেমন কেউ নেশা ছাড়তে পারে না, অনেক তরুণও লাইক-কমেন্ট আর শেয়ার ছাড়া থাকতে পারে না।
সময় নষ্ট: পড়াশোনা বা কাজের সময় না দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কনটেন্ট বানানোর পেছনে দিচ্ছে।
পরিবার থেকে দূরত্ব: পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে বেশি সময় কাটছে ফোনের স্ক্রিনে।
শারীরিক ক্ষতি: সারাদিন বসে ভিডিও এডিট করা বা নির্ঘুম রাত কাটানো শরীরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিযোগিতা:
ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় অনেকেই এমন সব কাজ করছে যা একেবারেই বিপজ্জনক। কেউ ট্রেনের ছাদে উঠে ভিডিও করছে, কেউ উঁচু ভবনের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, কেউ আবার খাবারে বিপজ্জনক কিছু মিশিয়ে “চ্যালেঞ্জ” করছে। এইসব কনটেন্টের উদ্দেশ্য একটাই মানুষকে চমকে দেওয়া। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা একদিকে জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে, অন্যদিকে সমাজেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ছোটরা এগুলো দেখে অনুকরণ করতে চাইছে, যা ভয়ঙ্কর বিপদের ইঙ্গিত দেয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট:
যারা ভাইরাল হতে পারছে না, তাদের ভেতরও তৈরি হচ্ছে হতাশা ও মানসিক চাপ। তারা ভাবে, “আমি কেন জনপ্রিয় হচ্ছি না?” অনেকের নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। কেউ কেউ একাকিত্বে ভুগছে। আবার ডিপ্রেশন ও উদ্বেগ রোগও বাড়ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার চেষ্টায় থাকে, তাদের মধ্যে মানসিক চাপ ও হতাশা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মত:
মনোবিজ্ঞানী ড. হাসান মাহমুদ বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া আসলে তরুণদের আত্মমূল্যায়নের জায়গাটি দখল করে নিচ্ছে। আগে একজন তরুণ তার সাফল্য বিচার করত পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র বা দক্ষতার ভিত্তিতে। এখন তারা বিচার করছে লাইক-কমেন্ট আর ফলোয়ার দিয়ে। এর ফলে তারা দ্রুত হতাশাগ্রস্ত হচ্ছে।”
অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমও অনেক সময় এ প্রতিযোগিতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বেশি ভিউ পেতে হলে ব্যবহারকারীকে বারবার নতুন, অদ্ভুত ও চমকপ্রদ কিছু করতে হয়। ফলে তরুণরা নিজেদের সীমা অতিক্রম করছে কেবল ভাইরাল হওয়ার জন্য।

সামাজিক প্রভাব:
এই নেশা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে করে পরিবারে সময় দেওয়া কমে যাচ্ছে, বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, বাস্তব জীবনের মূল্যবোধের চেয়ে ভার্চুয়াল খ্যাতি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে সমাজে এক ধরনের “ফাঁপা প্রতিযোগিতা” তৈরি হচ্ছে, যেখানে সাফল্যের মানদণ্ড হয়ে উঠছে লাইক ও ভিউ সংখ্যা।

অর্থনৈতিক দিক:
ইউটিউব বা ফেসবুক থেকে আয়ের সুযোগ থাকায় অনেক তরুণ মনে করছে ভাইরাল হলেই অর্থ আসবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অল্প কিছু মানুষ সফল হলেও অধিকাংশ তরুণ প্রত্যাশিত আয় করতে পারছে না। ফলে ক্রমান্বয়ে হতাশা বাড়ছে। অনেকে ভিউ বা সাবস্ক্রাইবার কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। কেউ কেউ আবার অবৈধ উপায়ে অর্থ রোজগারের পথ খুঁজছে, যা আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট:
এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো বিশ্বেই এখন আলোচনার বিষয়। আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশে “ভাইরাল কালচার” তরুণদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি দেশে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ ভিডিওর কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব দেখে অনেক সরকার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও কঠোর নীতিমালা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।

করণীয়: এই ভয়ংকর নেশা থেকে তরুণদের বাঁচাতে কিছু পদক্ষেপ জরুরি,যেমন-

পরিবারের ভূমিকা:
সন্তানকে সময় দেওয়া,
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া,
বাস্তব জীবনের সাফল্যের মূল্য বোঝানো।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা:
স্কুল-কলেজে “ডিজিটাল লিটারেসি” বা সচেতনতা বিষয়ক ক্লাস চালু করা,
শিক্ষার্থীদের সঠিক কনটেন্ট ক্রিয়েশন শেখানো।

সামাজিক সংগঠন ও সরকারের ভূমিকা:
জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো,
বিপজ্জনক কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া,
তরুণদের বিকল্প প্ল্যাটফর্মে সৃজনশীল কাজের সুযোগ দেওয়া।

পরিশেষে: ভাইরাল হওয়ার শর্টকাট যত আকর্ষণীয়ই মনে হোক, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর ফাঁদ। ক্ষণিকের আনন্দ ও জনপ্রিয়তার নেশা তরুণদের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের একসাথে কাজ করা। আমাদের তরুণদের বোঝাতে হবে ভালো মানুষ হওয়া, দক্ষতা অর্জন করা আর সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখাই আসল সাফল্য। লাইক-কমেন্ট নয়, মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানই হোক জীবনের আসল অর্জন।

লেখক পরিচিতি : মোঃ মহসিন হোসাইন
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
সভাপতি-মানবতার ডাক সাহিত্য পরিষদ

ফোকাস মোহনা.কম