বিলুপ্তির পথে ভোলাভুলি উৎসব

।। এস ডি সুব্রত।। ভোলা সংক্রান্তি বা ভোলাভুলি সংক্রান্তি বাঙালী কৃষ্টির একটগুরুত্বপূর্ণ  অংশ। এক সময় কার্তিক মাসের শেষদিন গ্রাম বাংলার প্রায় ঘরে ঘরেই এ উৎসব হতো।বাঙালি জাতির সংস্কৃতির মূল হাজারো বছরের গভীরে প্রোথিত।বাঙালি সংস্কৃতির  বয়স প্রায় দুই হাজার বছর হবে। আমাদের এই উপমহাদেশের ঐশ্বর্য একসময় সংস্কৃতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শতশত বছর ক্ষমতার খঞ্জর চালিয়ে শাসন ও শোষণ করেছে বর্গীরা। বারবার লুন্ঠিত হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বারোয়ারি সঙ্গমে মুমূর্ষু হয়েছিল বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য  সংস্কৃতি।  আমাদের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য আজ ধ্বংস প্রাপ্ত। হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালি সংস্কৃতির নানান আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব। বাঙালির অনেক  উৎসবেরএকটি উৎসব হলো ভোলাভুলি উৎসব।শুকনা পাটপাতা ও কয়েকটা মশা-মাছি রাখিয়া আগুন ধরাইয়া দেওয়া হয়। তার পর একজন সেই জ্বলন্ত মূর্তিটিকে লইয়া চতুর্দিকে দৌঁড়ায়, আর চিৎকার করিয়া বলে- ——-
‘ভালা আইয়ে- বুরা যায়,
মশা-মাছির মুখ পোড়া যায়।
দো! দো! দো!’
ঐ সময় আরও কয়েকজন কুলা পিটাইতে পিটাইতে তাহার পিছনে পিছনে ছুটে এবং দো দো বলিয়া থাকে। ঐরূপে পথে প্রান্তরে আনাচে কানাচে অনেকক্ষণ ছুটিয়া দগ্ধপ্রায় মূর্তি মাঠে দাঁড় করিয়া রাখা হয়।”
কার্তিক মাসের শেষ দিনে ভোলাভুলির অনুষ্ঠান করা হয়। সন্ধ্যায় বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরিকৃত প্রতিকৃতিতে মালা পড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় এবং কীর্তন পরিবেশনের মাধ্যমে ঐ প্রতিকৃতি পুড়ানো হয়। মানুষের ধারনা ছিল যে, ঘরের যাবতীয় খারাপ বা মন্দ জিনিস পুড়িয়ে দেয়া হয়। সন্ধ্যায় অনেক শিশুরা পাট শোলার কাটিতে বা কাপড়ে কেরোসিন দিয়ে এ’বাড়ি সে বাড়ি দৌঁড়ে বিভিন্ন ধরনের ছড়া কাটতো। ছড়ার মধ্যে ছিল——-
‘ভালা আয়, বুরা যায়,
মশা মাছি পোড়া যায়।’
ভোলা পোড়ার পর ঘরের দরজায় লাঠি টোকা দিয়ে সমবেতভাবে ছড়া বলা হতো ———–
‘মশা মাছি বাইরও
টাকা পয়সা ঘর ল
সংসারের জঞ্জাল দূর-হ’ ।
‘ভোলাভুলি’র অন্যতম আকর্ষণ ছিল- এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে গিয়ে কলা গাছের ডাল দিয়ে মানুষের ‘ভোলা’ ছাড়ানো। এই ভোলা ছাড়ানোর সময় বলা হতো-
‘ভোলা ছাড়, ভুলি ছাড়
বার মাইয়া পিছা ছাড়।
ভাত খাইয়া লড়চড়
পানি খাইয়া পেঠ ভর।
খাইয়া না খাইয়া ফোল
হাজার টাকার মূল’ ।
 ‘ভোলাভুলি’ নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সামব্যাপী চলত আয়োজন। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকেরা কার্তিক মাসকে নিয়ম মাস হিসেবে পালন করতো। এ সময় প্রতিদিন সকালে স্নান করে দেবতাকে ভোগ দেয়া হতো। আর মাসব্যাপী এই সংযমের শেষদিন ভোলা সংক্রান্তি হিসেবে এই ‘ভোলাভুলি’ পালন করা হয়।
কিন্তু ‘ভোলাভুলি’ এখন বিলুপ্তের পথে। তবে এখনো গ্রামের কিছু কিছু এলাকায় এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়।
‘ভোলাভুলি’তে প্রতিটি গ্রামে গ্রামে অনেক আনন্দ উৎসব হতো। অনেকে মাইক দিয়ে গান বাজনা করত। কিন্তু এখন শুধু সন্ধ্যার সময় ভোলা পোড়ানো ছাড়া আর কোন অনুষ্ঠান হতে দেখি না।’
 ঐদিন সনাতন ধর্মালম্বীরা বাড়ি বাড়ি কার্তিক পূজা পালন করা হয়ে থাকে। অনেক বাড়িতে বাড়ি ঘর সাজানো ও ভাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। যদিও আজ এ উৎসব গ্রাম বাংলা থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এ প্রজন্মের অনেকেই ভোলাভুলি সম্পর্কে জানেই না।
ঐদিন সনাতন ধর্মালম্বীরা বাড়ি বাড়ি কার্তিক পূজা পালন করা হয়ে থাকে। অনেক বাড়িতে বাড়ি ঘর সাজানো ও ভাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। যদিও আজ এ উৎসব গ্রাম বাংলা থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এ প্রজন্মের অনেকেই ভোলাভুলি সম্পর্কে জানেই না।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।

ফোকাস মোহনা.কম