বিজয় মিছিলে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন শহীদ আমির হোসেন

চাঁদপুর: রাজধানীর উত্তরায় একটি ডেভেলপমেন্ট কোম্পানীতে চাকরি করতেন গাড়ী চালক আমির হোসেন (৩২)। গেল বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেখানকার লোকজনের সাথে উত্তরা মডেল টাউন এলাকায় বিজয় মিছিলে যোগদেন। সেখানেই তিনি বুকে ও গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। আমির হোসেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার সুবিদপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও গ্রামের গোযার বাড়ির খোরশেদ আলমের ছেলে।

সম্প্রতি শহীদ আমিরের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার বাবা ও মায়ের সাথে। বাড়ির সামনেই পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হয় তাকে। কবরের পাশেই খুটিতে লাগানো ছিলো জাতীয় পতাকা। আমির হোসেন এলাকায় পরিচিত না হলেও শহীদ হওয়ার পর থেকে নিজ গ্রামের ছোট-বড় সবার কাছে পরিচিত।

কথা বলে জানাগেল, আমির হোসেনের বাবা খোরশেদ আলম (৫৮) এক সময় ঢাকায় একটি পোষাক প্রস্তুতকারক কোম্পানীতে চাকরি করতেন। করোনাকাালিন সময়ে তিনি চাকরি হারিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। এখন নিজ বাড়িতেই কৃষি কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করেন।

আমির হোসেনের মা রাহিমা বেগম (৫৫) গৃহিনী। তারা ৩ ভাই ও ৪ বোন। এক বোন মারাগেছে। সবার বড় আলমগীর (৩৬) ও মনির হোসেন (৩৪)। তারা চট্টগ্রাম রিয়াজ উদ্দিন বাজারে মাছের দোকানে কাজ করে। ৪ বোনের মধ্যে ছোট বোন মারাগেছে। বাকী রুবিনা (২৯) সালামা (২৬) ও ফেরদৌসির (২৪) বিয়ে হয়েছে।

ভাই বোনদের মধ্যে শহীদ আমির হোসেন তৃতীয়। স্থানীয় বড়গাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেনীতে পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। এর আগে বড়গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ শ্রেণীর পাঠ শেষ করেছেন।

শহীদ আমির হোসেনের শশুর মৃত সাধু মিয়া আরো অনেক বছর আগে মারা গেছেন, শাশুড়ী আয়শা বেগম (৫৫) গৃহীনী।

শহীদ আমির হোসেন নিজের পছন্দে বিয়ে করেন কর্মস্থল এলাকায় পরিচিত কুমিল্লা জেলার লাকসামের মেয়ে জেসমিন আক্তার রুপাকে। তাদের দুই পুত্র সন্তান। বড় ছেলে ইয়াছিন (৪) ও ছোট ছেলে ইব্রাহীম বয়স দেড় বছর।

এই শহীদের গ্রামে নিজের দুইচালা একটি ঘর থাকলেও স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকতেন আব্দুল্লাপুর এলাকায় একটি বাড়া বাড়িতে। আমির হোসেন চালক হিসেবে উত্তরা মডেল টাউন ৪ নম্বর সেক্টরে ডেভেলপমেন্ট কনসট্রাকশন লিমিটেড নামে কোম্পানীতে।

শহীদ আমিরের মা রাহিমা বেগম বলেন, ৫ আগস্টের কয়েকদিন আগে আমি ও আমার স্বামী চট্টগ্রাম বড় দুই ছেলের বাসায় বেড়াতে যাই। ৫ আগষ্ট বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আমার ছেলে শহীদ আমির হোসেন ফোন দেয়। আমাদের খোঁজ খবর নেয়। ফোনে আমাকে ছেলে বলছিল-মা ‘শেখ হাসিনাকে গদি থেকে নামাইয়ে দিছে। আমিও যাই।’ কোথায় যাই সে কথা বুঝতে পারি না। পরে জানতে পারলাম ছেলে আমার বিজয় মিছিলে গিয়েছে। এসব কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহিমা বেগম।

তিনি বলেন, ছেলে আমার ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। ছোট বেলা থেকেই সে ধার্মিক। গেল বছর ঈদুল আজহার পরে বড় নাতি ইয়াছিনকে নিয়ে বাড়িতে আসেন। সময় পেলে বাড়িতে আসত আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। সব সময় ফোন করে খোঁজ নিত আমাদের। তার বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় আমাদের সংসারের সব খরচই দিতেন আমার ছেলে। কেন আমার ছেলেকে গুলিকরে হত্যা করা হলো তার বিচার চাই। কিভাবে চলবে আমাদের অভাবের সংসার সরকারের প্রতি প্রশ্ন রাখেন রাহিমা বেগম।

আমির হোসেনের বাবা খোরশেদ আলম বলেন, ৫ আগস্ট সন্ধ্যার পরে চট্টগ্রাম থেকেই জানতে পারি আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাগেছে। তার মরদেহ উত্তরা মডেল টাউন এলাকার মেডিকেল কলেজ ফর ওমেন এণ্ড হসপিটালে আছে। সেখান থেকে আমাকে ফোন করে হাসপাতালের লোকজন। আমাদের সাথে কথা বলেই বিজয় মিছিলে যায় ছেলে। মডেল টাউন এলাকায় মিছিলে গেলে তার গলায় ও বুকে ৯টি গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। তারপরেও লোকজন হাসপাতলে নিয়ে আসে। হাসপাতালের লোকজন আমাকে ফোন দিলে তাদের কাছ থেকে সময় নিয়ে কিভাবে মরদেহ বাড়িতে আনব সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। আমার দুই জামাতা জহিরুল ইসলাম ও হাবিব ঢাকায় থাকেন। তাদের সাথে কথা বলে হাসপাতালে পাঠাই। তারা মরদেহ নিয়ে জামাতা জহিরুল ইসলামের কর্মস্থল নারায়নগঞ্জের রুপগঞ্জে নিয়ে রাতে রাখেন। পরদিন ৬ আগস্ট সকালে বাড়িতে নিয়ে আসেন। দুপুর ১২টার দিকে নামাজে জানাজা শেষে ছেলেকে দাফন করা হয়।

তিনি আরো বলেন, ছেলের মৃত্যুর পর ছেলেও বউ বাড়িতে চলে আসেন নাতিদের নিয়ে। পরে ঘটনাস্থল এলাকা থেকে ফোন আসে যাওয়ার জন্য। আমার স্ত্রী, ছেলের বউ ও নাতিদের নিয়ে আব্দুল্লাহপুর বাড়া বাড়িতে গিয়ে ১৫ দিন ছিলাম। সেখানে জামায়াতের লোকজন ২লাখ টাকা এবং অন্যান্য লোকজন অনুদানসহ ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা অনুদান দেন ছেলের বউকে। এরপর আমরা বাড়িতে চলে আসি। গ্রামেও ফরিদঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থেকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহযোগিতা করে। এরপরেও জেলা প্রশাসন ও জুলাই ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছে ছেলের বউ।

ডেভেলপমেন্ট কনসট্রাকশন লিমিটেড কোম্পানীর প্রকৌশলী শাকিল আহমেদ টেলিফোনে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন আমির হোসেন এই কোম্পানির একজন ড্রাইভার ছিল। গেল বছর ৫ আগষ্ট আমাদের অফিসের ছুটি ছিল কিন্তু সে জানতোনা। পরে অফিসে এসে অফিস বন্ধ দেখে এখান থেকে চলে গেছে। পরে বিকেলে শুনেছি সে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। আমরা কোম্পানির পক্ষ থেকে তার জন্য গাড়ি ঠিক করে দিয়েছি এবং দাফন-কাপন এর জন্য খরচ দিয়েছি। সামনে চেষ্টা করছি তাদেরকে কিছু সহযোগিতা করতে, যাতে তার ছোট বাচ্চাদের উপকার হয়।

চালক শহীদ আমির হোসেনের স্ত্রী জেসমিন আক্তার কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমরা কি নিয়ে বাচঁবো এখন। এই ছোট দুটো বাচ্চাকে নিয়ে। কী করে সামনে আমি তাদেরকে খাওয়াবো পরাবো, আমার স্বামী আমাকে এবং আমাদের সন্তানদের খুব ভালোবাসতো, কত স্বপ্ন ছিল বাচ্চাদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করবে, তা আর হলোনা। সরকারি এবং মানুষের সাহায্য ছাড়া সামনে চলা একেবারেই অসম্ভব। তাই আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি আমাদেরকে সহযোগিতার আওতায় এনে চলার মত একটি পথ তৈরি করে দিতে। ঘরের ভিটা ছাড়া আর কোন জমিও নেই স্বামীর।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম