
এস ডি সুব্রত।। বঙ্গবন্ধু এদেশের আপামর জনতার নয়নের মণি হয়ে উঠেছিলেন যেমন শক্তি,সাহস আর দেশপ্রেমের কারণে তেমনি অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছিলেন তার অন্যতম আদর্শিক ভিত্তি ধর্ম নিরপেক্ষতা বা অসম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে। যদিও তার রাজনীতি শুরু হয়েছিল মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত হয়ে তথাপি তিনি এক সময় এ থেকে বেড়িয়ে এসেছিলেন।তার কণ্ঠে আমরা শুনতে পাই, ….”বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান বাংলাদেশে যারা বসবাস করেন , তারা সকলেই এদেশের নাগরিক।সকল ক্ষেত্রে তারা সম অধিকার ভোগ করবেন। ” রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান এর মতে …….” জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে দরিদ্র মুসলিমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে এমন একটি চিন্তা থেকে ই শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগে তিনি উদারপন্থী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী ছিলেন। তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক ছিলেন না।
১৯৪৬ সালে কলকাতায় বিভিন্ন স্থানে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার সময় শেখ মুজিব দাঙ্গার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বাংলার হিন্দু মুসলমান সকলের অধিকারের কথা ভেবেছিলেন। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন ……” ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষে ব্যাপক সাড়া পেয়ে মুসলিম লীগ বিরোধী একটা দল গঠনের ছয় বছরের মধ্যেই শেখ মুজিব সে দলের নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দ টি বাদদিয়েছিলেন।”বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক ছিলেন বলেই সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে ধর্ম নিরপেক্ষতা কে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টির করনেই এটা সম্ভব হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ব্যক্তি জীবনে ছিলেন ধার্মিক।লোক দেখানো ধর্ম পরায়নতা তিনি বিশ্বাস করতেন না। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে। ১৯৩৮ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ এ আসেন তখন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের দায়িত্ব পড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের রহমানের উপর। শেখ মুজিব তখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র।
শেখ মুজিবের ভাষায় “আমি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করলাম দলমত নির্বিশেষে সকল কে নিয়ে। কিন্তু হিন্দু ছাত্র রা সেখান থেকে সড়ে পড়তে লাগলো। পরে জানা গেল কংগ্রেস থেকে নিষেধ করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে না থাকার জন্য । তখনকার দিনে গোপালগঞ্জ এ শতকরা ৮০ ভাগ দোকান ছিল হিন্দুদের। এ খবর শুনে আমি বিস্মিত হলাম। কারন আমার কাছে হিন্দু মুসলমান কোন বিষয় ছিল না । হিন্দু ছেলেদের সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব ছিল। একসঙ্গে গান বাজনা বেড়ানো খেলাধুলা সবই চলত।” একজন সৎ ও সাহসী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু কে শ্রদ্ধা করতেন, কোনদিন তিনি ভাবেননি তার শ্রদ্ধা র মানুষটি কোন ধর্মের। সুভাষ চন্দ্র বসুর সাহস ও কর্ম কান্ড। তাকে অনুপ্রেরণা দিত। বঙ্গবন্ধু ভাবতেন যে নেতা দেশকে ভালবেসে দেশ ত্যাগ করতে পারেন, সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারেন তিনি কোনদিনই সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না।
মনে মনে সুভাষ বসু কে শ্রদ্ধা করতেন শেখ মুজিব। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর মদদে পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় রামেেন্দু মজুমদারের আত্নীয় অজিত গুহ ফোন করে যখন বঙ্গবন্ধু কে বলছিল আমার এক আত্মীয় তেেজগাঁঁওয়়ে আতঙ্কে র মধ্যে আছে , তুমি যদি তাদের কে উদ্ধার করতে পার। কিছু ক্ষণেে র মধ্যে বঙ্গবন্ধু রামেে্দু মজুমদার এর বাসায় উপস্থিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন রামেন্দু মজুমদারের পরিবারের সবাইকে নিয়ে সোজা তার বাসায় চলে যান। সেখানে গিয়ে রামেন্দু মজুমদার সেখানে গিয়ে দেখেন বঙ্গবন্ধুর বাসায় আরো কয়েকটি সংখ্যালঘু পরিবারের লোকজন। মানুষ মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকারীদের মোকাবেলা করা ,কয়জন এটা করতে পারে। বঙ্গবন্ধু সেটা করতেন। বাঙালি জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর অসম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতার সংগ্রামে মুগ্ধ ব্রিটেনের মানবতাবাদী নেতা লর্ড ব্রোকওয়ে বঙ্গবন্ধু কে জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী ও দ্য ভ্যলেয়ার এর চেয়ে বড় করে দেখেছেন।১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্সের ময়দানে এক ভাষনে বলছিলেন …” আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র হবে । রাষ্ট্রের স্তম্ভ কোন ধর্মীয় কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত হবে না।”
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, শাল্লা , সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
sdsubrata2022@gmail.com



