ফটিকখিরা ছালামত উল্যাহ-আমেনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নারীশিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা রাখছে

ছবি: সংগ্রহীত।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার অজ পাড়াগাঁয়ে নারী শিক্ষা বিস্তারে স্থাপিত ফটিকখিরা ছালামত উল্যাহ-আমেনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অত্র এলাকায় নারীশিক্ষা বিস্তারে এক অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে।
১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ শাহরাস্তি উপজেলার রায়শ্রী দক্ষিণ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ফটিকখিরা গ্রামের কৃতিসন্তান সমাজ সেবক ও ইষ্টার্ণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক খায়রুল আলম তাঁর মরহুম বাবা ছালামত উল্যাহ ও মা আমেনা বেগমের স্মৃতি রক্ষার্থে নারী শিক্ষা বিস্তারে এই বিদ্যালয়টি এলাকার হত-দরিদ্র, কৃষক-দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিতে এমন একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তার ইচ্ছার ফলশ্রুতিতে এলাকার কতিপয় শিক্ষানুরাগী সহ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে তিনি বহুবার এলাকায় বৈঠকে বসেন।
এলাকার শিক্ষানুরাগী মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা পেয়ে খায়রুল আলম বিদ্যালয়টি স্থাপনে আশার আলো দেখতে পান এবং প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের কাজে মনোনিবেশ করেন। জনাব আলম এর ইচ্ছা বাস্তবায়নে তারই ছোট ভাই এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলাম সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি ও তার ছোট ভাই নিজেদের পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত ৭৫ শতক জমিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহন করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, একই ক্যাম্পাসে ফটিকখিরা আমেনা স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি অবস্থিত। উক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপনের জন্যেও তারাই ৩৩ শতক জায়গা দান করেছেন। ফটিকখিরা ছালামত উল্যাহ-আমেনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাকালে প্রয়োজনীয় দালানকোঠা ও আসবাবপত্র তৈরির এবং ডোবা জায়গা ভরাট বাবদ প্রয়োজনীয় সমুদয় অর্থ খায়রুল আলম ও তার ভাই মোঃ রফিকুল ইসলাম যোগান দিয়েছেন। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠাকালে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বেসরকারি কোম্পানীর উচ্চ পদের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে বেশ কয়েক বছর বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে জুনিয়র স্কুল অর্থাৎ ৮ম শ্রেণি দিয়ে বিদ্যালয়টি শুরু করেন। এই বিদ্যালয়টি শাহরাস্তি উপজেলার প্রথম নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যা ১৯৯৮ সালে নিম্ন মাধ্যমিক এবং ২০০৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০৪ সালে এই বিদ্যালয় হতে প্রথম বারের ন্যায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে শতভাগ উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং ঐ বছরই কুমিল্লা বোর্ডে ৭ম স্থান লাভ করে। তাছাড়া ২০১৬ সালে শাহরাস্তি উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গৌরব অর্জন করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি প্রায় চার হাজার ছাত্রী এই বিদ্যালয় হতে পড়াশুনা শেষ করে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন শেষে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত আছেন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৪৬ জন।
অত্র বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১০ জন শিক্ষক ও ৬ জন কর্মচারী কর্মরত আছেন। কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীগন হচ্ছেন :-
১.জনাব মোঃ রফিকুল ইসলাম, প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ২. দীন মোহাম্মদ,সহকারী প্রধান শিক্ষক ৩. মোঃ মজিবুর রহমান, সিনিয়র শিক্ষক ৪. মোঃ জসিম উদ্দিন, সিনিয়র শিক্ষক ৫. স্বপ্না চক্রবর্ত্তী, সিনিয়র শিক্ষক ৬. মাহমুদা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক ৭. সুমনা শারমিন সরকার, সহকারী শিক্ষক ৮. মনিরুল ইসলাম,সহঃ শিক্ষক ৯. অলি উল্যাহ,সহকারি শিক্ষক ১০. এমরান হোসাইন, সহকারি শিক্ষক ১১. মোঃ দেলোয়ার হোসেন, অফিস সহকারী ১২. মোঃ নজরুল ইসলাম, ৪র্থ কর্মচারী ১৩. বিলকিছ বেগম, আয়া ১৪.তাজুল ইসলাম, নৈশ প্রহরী, ১৫. জান্নাতুল মাওয়া, অফিস সহায়ক ও ১৬. ইমরুল ইসলাম, নিরাপত্তা কর্মী
শাহরাস্তি-হাজীগঞ্জ আসন থেকে বারবার নির্বাচিত সাংসদ ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম মহোদয়ের বিশেষ দৃষ্টি এই বিদ্যালয়ের প্রতি রয়েছে। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর হতে অত্র বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ পাওয়া একটি ভবন সম্প্রতি চার তলা ভিত্তি প্রস্তর দিয়ে একতলা নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। নতুন ভবনটি মাননীয় সাংসদ উদ্বোধন করেছেন। যা বর্তমানে বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষ, বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল ল্যাব ও অফিস কক্ষ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বিদ্যালয়ে শ্রেণি কক্ষের সংখ্যা অপ্রতুল।তাই আরও শ্রেণি কক্ষ নির্মাণ করা প্রয়োজন।এবিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাননীয় সাংসদ মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলামের সদয় দৃষ্টি কামনা করেন। অত্র বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ ভাল। তবে ছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিদ্যালয়ের সুরক্ষা প্রাচীর ও গেইট নির্মাণ অতি আবশ্যক। এছাড়া পূর্বদিকের গ্রামগুলো থেকে যে সকল শিক্ষার্থী অত্র বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে আসেন তাদের যাতায়তের জন্য রাস্তাটি কাঁচা  হওয়ায় একটু বৃষ্টিতে রাস্তাটি কাদায় সয়লাভ হয়ে পড়ে ফলে ছাত্রীদের যাতায়তে বেশ অসুবিধা হয়। তাই এই রাস্তাটি পাকা হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি নিয়মানুযায়ী অত্র বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলামের বয়স ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ায় তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহন করেন।কিন্তু বিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অত্র বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাকালে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে তাঁকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের জন্য বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি দায়িত্ব অর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছেন। অবসর গ্রহনের পর থেকে তিনি এই পদে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, অত্র এলাকায় মানুষের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ গ্রহনের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের নিমিত্তে নিজের ও ক্রয়কৃত মোট ১০৮ শতক  জায়গা দান করেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তার অবর্তমানে যিনি বা যারা এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করবেন তারা নিশ্চয়ই এই প্রতিষ্ঠানটির উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য চেষ্টা করবেন।
লিখেছেন: মোঃ রুহুল আমিন, শাহরাস্তি, চাঁদপুর।

ফোকাস মোহনা.কম