প্রযুক্তিনির্ভরতা যেন পাপে প্রলুব্ধ না করে

মাওলা সাখাওয়াত উল্লাহ।। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন আমাদের জীবনকে সহজ ও সাবলীল করেছে। কিন্তু এই নির্ভরতা যেন আমাদের পাপের পথে ধাবিত না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রযুক্তির যুগে কম সময়ে বেশি তথ্য সামনে হাজির থাকে। এতে বেশি তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা বাছ-বিচার করার সময়-সুযোগ থাকে না।

ফলে প্রকৃত জ্ঞান আহরণ থেকে বঞ্চিত হয়। এতে অজ্ঞতা আরো বাড়ে। সে ভাবতে থাকে, ইন্টারনেটে জ্ঞানের দুয়ার অবারিত, পরে শিখে নেব। আসলে সে শিখতে পারে না। গাধার মতো অসংখ্য বই পিঠে বহন করে; কিন্তু শিখতে পারে না। যে যত বেশি প্রযুক্তিতে আসক্ত তত বেশি সে ডিপ্রেশন ও হতাশায় ভোগে। সে বাস্তব জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে বড় করে দেখে এবং একাকী তা নিয়ে ভাবতে থাকে।

প্রযুক্তি আসক্তি মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। সে বিনোদন জগৎ থেকে বের হতে পারে না। ফলে অন্যের জন্য ভাবার তার সময় থাকে না।

প্রযুক্তিনির্ভর মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অন্যের কর্মকাণ্ড তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। এবং সে জেদি মনোভাবাপন্ন হয়ে যায়।

প্রযুক্তিতে আসক্ত মানুষ যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সে যন্ত্রমানবে পরিণত হয়।

তথ্যের বিস্তৃতির কারণে প্রযুক্তি মানুষকে সত্য-মিথ্যায় বিভ্রান্ত করে তোলে। এতে সত্য অনুধাবন ও গ্রহণ তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। ফলে সে সাদা-কালো ও আলো-আঁধার পার্থক্য করতে পারে না।

প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে ভয় ও একাকিত্ব জীবনকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মনে করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, আসলে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জীবনের কোনো প্রয়োজনে এসব ‘ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড’ কোনো কাজে আসে না।

ফেসবুকের জীবন-যাপন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে সক্রিয় হ্যাকাররা জেনে যাচ্ছে পাসওয়ার্ড। নিজের অজান্তে হ্যাকারদের মাধ্যমেও গোপনীয় যেকোনো কিছুই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফেসবুকে ও অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অনেক ব্যক্তিগত তথ্য আমরা প্রকাশ করে থাকি। এ থেকেও লঙ্ঘিত হতে পারে নিজেদের গোপনীয়তা। আবার নিজেদের ফোন নম্বর, ই-মেইল, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর-এসবও নানাভাবে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে চলে যায় ব্যক্তিগত তথ্য। আমাদের লোভকে পুঁজি করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির তথ্যকে বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে।

ইন্টারনেট ব্যবহার করে মানুষ নানা ধরনের পাপ কাজ করে যাচ্ছে। যেমন: ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানা ধরনের মিথ্যা কথা ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে।

মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ও মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে এই ইন্টারনেটের মাধ্যমেই।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুবক-যুবতীরা বিভিন্নভাবে পর্নোগ্রাফির চিত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজেকে অশ্লীল ও খারাপ কাজে জড়িয়ে নিচ্ছে। ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা ইন্টারনেটে বসে লেখাপড়া বাদ দিয়ে বিভিন্ন গেইম ডাউনলোড করে সময় অপচয় করছে।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ইন্টারনেট ব্যবহার করে অপহরণ, গুম, খুন, হুমকি ইত্যাদি ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কোনো ব্যক্তির নামে কল্পকাহিনি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কথা ব্লগ কিংবা ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে।

বেশি পরিমাণে সামাজিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীলতা সত্যিকারের যোগাযোগের অনুভূতিকে কমিয়ে দিচ্ছে। এর ব্যবহারকারীরা একেই সত্যিকারের সম্পর্ক ভাবতে শুরু করেছে। শিশু পর্নোগ্রাফি তৈরি করা, মুদ্রণ করা, সংগ্রহ করা বা ধারণ করা একটি অপরাধ।

সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে, অল্প বয়স্করাও সেটিংয়ে লিপ্ত হচ্ছে?

স্টকিং ঘটে যখন একজন ব্যক্তি প্রতিপক্ষকে শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতি করার পথে নামে। কয়েকটি উদাহরণ হলো ভিকটিমকে ই-মেইল, মেসেজ বা ফোন কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা, ভিকটিমকে অনুসরণ করা, ভিকটিমের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো উপাদান অনলাইনে প্রকাশ করা, ভিকটিমের কম্পিউটার হ্যাক করা, ভিকটিমকে আপত্তিকর উপাদান প্রদান করা, ভিকটিমকে পর্যবেক্ষণ করা ইত্যাদি।

সোশ্যাল মিডিয়া ও সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইটগুলো আজকাল ব্যক্তিগত তথ্য পূরণের জন্য অনুরোধ করে এবং এটি বিশ্বজুড়ে সহজেই অ্যাক্সেসযোগ্য। যদিও অনেক গোপনীয়তা সেটিংস আছে, অনেকে এটি সম্পর্কে সচেতন নয়।

এটি মনে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ যে ইন্টারনেট একটি ডিজিটাল পদচিহ্ন এবং সাধারণ কাগজের মতো এর বিশদ বিবরণ মুছে ফেলা যায় না। তাই ছবি পোস্ট করার আগে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কিংয়ের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো, এটি ছাত্রদের অনেক সময় নষ্ট করে। গ্রেট ব্রিটেনে ২০০৮ সালের ডিজিটাল বিনোদন জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৫ থেকে ১৯ বছরের কম বয়সী ছাত্রদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হোমওয়ার্কের জন্য কম সময় বরাদ্দ করে এবং ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদির মতো সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলোতে বেশি সময় ব্যয় করে।

ইন্টারনেট বা অন্য কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করে যখন কেউ অন্যদের অপব্যবহার করে তখন তাকে সাইবার বুলিং বলা হয়। এ ধরনের সমস্যার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে দোষারোপ করার প্রধান কারণ হলো একটি বাজে গুজব শুরু করা, মন্তব্য করা, বিব্রতকর ছবি আপলোড করা বা অন্তরঙ্গ বার্তা পাঠানো এখানে সহজ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক প্রাণঘাতী স্ট্যান্ট আছে। যেমন-ট্রেনে ঝাঁপ দেওয়া, বাইক স্ট্যান্ট ইত্যাদি। তরুণরা এমন স্ট্যান্ট অনুসরণ করে, যা পরে তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ফম/এমএমএ/

ফোকাস মোহনা.কম