প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কুমিল্লার মৃৎশিল্পীরা

কুমিল্লা: আসন্ন শারদীয়া দূর্গাপূজাকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন কুমিল্লার মৃৎশিল্পীরা। বাঙালী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপুজা। এ উৎসব উপলক্ষে কুমিল্লা জেলায় এ বছর সাতশত চৌরানব্বইটি মন্ডপে অনুষ্ঠিত হবে দূর্গা মায়ের অর্চনা। আর মাত্র ১২দিন পরই স্বর্গলোক হতে মর্ত্যে আসছেন দেবীদুর্গা। তারই ধারাবাহিকতায় দূর্গা প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা।

আসছে ২৫ সেপ্টেম্বর রবিবার মহালয়া এবং ৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার পঞ্চমী তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয়া দুর্গা পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। কাঁশফোটা শরৎ এর শারদীয় দূর্গোৎসবকে পরিপূর্ণ রূপ দিতেই মন্দির গুলোতে চলছে পূজার প্রস্ততি। প্রতিমা শিল্পীর সুনিপুণ ছোয়া আর রংতুলির আঁচরে দেবী দূর্গার অনিন্দ্যসুন্দর রুপ দিতে দিন রাতভর চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। ইতোমধ্যে প্রতিমার কাঠামোর মাটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরপর শুরু হবে রং ও সাজসজ্জার কাজ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে জেলা প্রতিটি উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাজুড়ে আগাম শারদীয় উৎসবের আমেজ লক্ষনীয়। উচু-নিচুর বিভেদ ভুলে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একত্র করে মহা-সম্মেলন হয় বলে এ পূজাকে বলা হয় সার্বজনীন পূজা। আর শরৎকালে হয় বলে বলা হয় শারদীয় উৎসব।

দূর্গাপূজাকে সামনে রেখে কুমিল্লা জেলার ১৬টি উপজেলার ৭৯৪টি মন্ডপের পূজা উদযাপন কমিটি ব্যস্ত সময় পার করছে। কোন কোন মন্ডপে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি সাজসজ্জার প্রস্তুতি ও চলছে। আসছে ১লা অক্টোবর শনিবার দেবী দূর্গার বোধন পূজা ও অধিবাসের মধ্যে দিয়ে শুরু হবে পাঁচদিনব্যাপী সনাতন ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড়ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গাপূজা। স্থানীয় কারিগর ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে কারিগরবৃন্দ কুমিল্লায় এসে তৈরি করছে মাটির প্রতিমা। প্রতিটি পূজামন্ডপের জন্য তৈরি করা হচ্ছে দূর্গা, লক্ষী, সরস্বতী, কার্তিক, গনেশ, অসুর, সিংহ, মহিষ, পেচা, হাঁস, সর্পসহ বিভিন্ন প্রতিমা। হিন্দু সম্প্রদায়ের দূর্গতিনাশিনী দুর্গাদেবীকে বরণ করে নিতে মন্ডপে প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। ঢাক, ঢোল বাদ্যকাররা বাদ্যযন্ত্র ঠিকঠাক করে নিচ্ছে পাশাপাশি প্রতিমা শিল্পীরাও মহাব্যস্ত প্রতিমা তৈরিতে। মাটির কাজ শেষে রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হবে প্রতিমা। দেবীকে স্বাগত জানাতে সর্বত্র আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের আবালবৃদ্ধ বনিতা নারী-পুরুষসহ সব বয়সী মানুষ এ সর্ববৃহৎ শারদীয় উৎসবকে স্বার্থক করতে প্রহর গুনছে।

জেলা মুরাদনগর তথা বাঙ্গরা থানাধীন রামচন্দ্রপুর গ্রামের নিবাসী মৃৎশিল্পী শ্যামল চন্দ্র রুদ্রপাল ও হরিপদ চন্দ্র রুদ্রপাল বলেন- এ সময় আমরা প্রতিমা তৈরীর কাজে খুব ব্যস্ত থাকি। এ সময় আমাদের দিন-রাত শ্রম দিতে। আর ১২দিন পরেই দূর্গা পূজা আমাদের প্রতিমা তৈরীর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এখন রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। জেলার মুরাদনগর উপজেলার দড়িকান্দি নিবাসী স্বর্গীয় প্রকাশ চন্দ্র দাশ বাড়ীর দুর্গা মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করছেন মৃৎশিল্পী শ্যামল চন্দ্র রুদ্রপাল ও হরিপদ চন্দ্র রুদ্রপাল।

জেলা মুরাদনগর তথা বাঙ্গরা থানাধীন রামচন্দ্রপুর গ্রামের নিবাসী মৃৎশিল্পী হরিপদ চন্দ্র রুদ্রপাল বলেন- ‘এ বছর আটটি পূজা মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছি। বংশ পরম্পরায় এই কাজ করে আসছি। এ বছর প্রতিটি প্রতিমা তৈরির খরচ ৮০ হাজার টাকা নিলেও আমাদের পোষাবে না। কারণ প্রয়োজনীয় উপকরণের মধ্যে রঙ, কাপড়, পুঁথির মালা, পরচুলা, চুমকি, শোলা ও কারিগরের মজুরিসহ সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। শুধু পেশাটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এ কাজ করতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন- ‘বিগত দুই বছর করোনা মহামারির কারণে ঢিলাঢালাভাবে দায় সেরেছিল পূজা মণ্ডপ কমিটি। এ বছর আশায় বুক বেধেছিলাম, কিন্তু বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে সব কিছুর দাম বেড়েছে। তাই খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবারও লোকসান গুনতে হবে। স্থানীয় পূজা কমিটিও এ বাজেট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মৃৎশিল্পীদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এই কাজ করে আর পোষায় না।’

ওই মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি সুবাস চন্দ্র মজুমদার বলেন- ‘বর্তমানে বাজারমূল্য ঊর্ধ্বগতির কারণে দুর্গা পূজা অর্চনা, প্রসাদ কেনার খরচ-সবমিলিয়ে কমিটির সদস্যরা হিমশিম খাচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার বলেন- শরৎ এর কাশফুল আর নীল আকাশে শুভ্র মেঘ বলে দেয় বিপদনাশিনী দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। হিন্দু সম্প্রদায়ের আবালবৃদ্ধ বনিতা নারী-পুরুষসহ সব বয়সী মানুষ দেবীর আশীর্বাদ পাওয়ার আশায় প্রতিজ্ঞায় প্রহর গুনছে পূজার এই শুভ লগ্নে। তিনি আরও বলেন- আগামী ১ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এ বছর মা দুর্গা গজে (হাতি) আগমন করবেন। এর অর্থ শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা। আর বিজয়া দশমীতে গমন করবেন নৌকায়। এর অর্থ শস্যবৃদ্ধি আশানুরূপ হলেও বন্যা ও জলোচ্ছাসে কিছু শস্য নষ্ট হবে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ট্রাস্টি নির্মল পাল বলেন- ‘জেলায় ৭৯৪টি পূজা মণ্ডপ রয়েছে। জেলাশহরসহ উপজেলা ভিত্তিক প্রতিটি কমিটিকে ডিজেপার্টির নামে অশ্লীলতা বন্ধের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা ঘটাতে না পারে সে জন্য পুলিশ প্রশাসন সর্বদা দায়িত্ব পালন করবে। আমরা সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।’

কুমিল্লার নবাগত পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান বলেছেন- আসন্ন দুর্গাপূজায় যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে জেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপে থাকবে গোয়েন্দা নজরদারী। যেসব পূজামণ্ডপে দর্শন্যার্থীর সংখ্যা বেশি থাকবে সেসব পূজামণ্ডপে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। পূজা জেলাশহরে ছিনতাই ও চাঁদাবাজ ঠেকাতে মাঠে থাকবে সাদা পোশাকধারী পুলিশ। এ ছাড়াও মাদক, কিশোরগ্যাং, সন্ত্রাস, ইভটিজিং ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ প্রতিরোধে নিরলসভাবে কাজ করবে কুমিল্লা জেলার পুলিশ টিম। যে কোন অন্যায় রুখতে আমরা পিছপা হবো না। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করবে কুমিল্লা জেলা পুলিশ।

বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদক-২০২২ প্রাপ্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান- সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয়া দুর্গাপূজাকে বাঙালীর সার্বজনীন উৎসবে রূপ দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। দুর্গাপূজায় যেকোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পূজা মণ্ডপে থাকবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ গোয়েন্দা নজরদারী।

এছাড়াও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে থানা পুলিশের পাশাপাশি পূজামণ্ডপে থাকবে আনসার, গ্রামপুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবী সদস্য।

ফম/এমএমএ/তাপস/

তাপস চন্দ্র সরকার | ফোকাস মোহনা.কম