পদ্মা-মেঘনার ভাঙন প্রতিরোধে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের দাবী

শহরের পুরান বাজার শহর রক্ষা বাধের বর্তমান পরিস্থিতি। ছবি: ফোকাস মোহনা.কম।

চাঁদপুর : চাঁদপুর শহরসহ পদ্মা-মেঘনা নদীর পূর্ব ও পশ্চিমের চরাঞ্চলে বসবাসকারী লোকজন বহু বছর ভাঙনের শিকার। দীর্ঘ বছরে ৭ থেকে ৮ বার মেঘনার ভাঙনের শিকার হয়েছেন হাজার হাজার পরিবার। এতে নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ফসলী জমি। শহর রক্ষা বাঁধের পাশে বসবাসকারী পরিবারগুলো, ব্যবসায়ী ও চরাঞ্চলের বাসিন্দারা পদ্মা-মেঘনার ভাঙন থেকে রক্ষায় সরকারের কাছে স্থায়ী এবং শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন। বর্তমানে চাঁদপুর সদর, হাইমচর ও মতলব উত্তর উপজেলার ২৪টি ইউনিয়নের ৯৬ হাজার ৩৮০ পরিবার পদ্মা-মেঘনা নদীর ভাঙন ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। ইতোমধ্যে ‘চাঁদপুর শহর সুরক্ষা নামে একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির এখনো অধিকতর যাচাই বাছাই কাজ চলমান।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুর এর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, সেন্টার ফর এনভায়রমেন্টাল এণ্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশান সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এর সমীক্ষার খসড়া প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।

সিইজিআইএস এর প্রতিবেদন থেকে জানাগেছে, ১৯৭২ সালে চাঁদপুর শহর নদী ভাঙণে আক্রান্ত হয়। তখন সরকার নিজস্ব অর্থায়নে চাঁদপুর শহর রক্ষা প্রকল্প (১ম পর্যায়) কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পরে এফডিআর এর অধীনে চাঁদপুর শহর রক্ষার জন্য সীমিত আকারে কাজ করা হয়। এরপর ১৯৯৭ সালে সম্পূর্ণ পাউবোর নিজস্ব পরিকল্পনা ও নকশার মাধ্যমে চাঁদপুর শহর সংরক্ষণ প্রকল্প (২য় পর্যায়) শিরোনামে কাজ আরম্ভ হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর শহর রক্ষা বাঁধ আরো শক্তিশালী করার লক্ষে কাজ শুরু করেন। সর্বশেষ চাঁদপুর শহর সুরক্ষার জন্য ৩ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা ব্যয়ের ৩ হাজার ৩শ’ ৬০ মিটার এর একটি প্রকল্প চূড়ান্ত করেছেন।

প্রতিবেদন থেকে আরো জানগেছে, চাঁদপুর শহরের অবস্থান মেঘনার বাম তীরে, যেখানে মেঘনা ও পদ্মার প্রবাহ মিশেছে। এই এলাকাটি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং গভীর। তাই নদী ভাঙনের জন্য শহরটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রকল্প বাস্তবায়ন না করা হলে বিদ্যমান নদীতীর ক্ষয়প্রাপ্ত হবার কারণে শহরটি ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকবে। আর প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মূল্যবান জমি ও সম্পদ বাঁচবে এবং নদী ভাঙন থেকে নদীতীরের বাসিন্দারা রক্ষা পাবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুর এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, জেলার মতলব উত্তর উপজেলা থেকে শুরু করে হাইমচর উপজেলা পর্যন্ত পদ্মা নদী ৫ কিলোমিটার, মেঘনা নদী ৫৮ কিলোমিটার। বর্তমানে ভাঙন প্রবণ এলাকা প্রায় ১২ কিলোমিটার। এ পর্যন্ত চাঁদপুর সদর ও হাইমচরে নদী তীর সংরক্ষণ হয়েছে ২১.৫৮৯ কিলোমিটার। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ১০.৩০০ কিলোমিটার। এরমধ্যে হানারচর হতে হামইচর উপজেলার নয়ানী ৪.০০ কিলোমিটার, হাইমচর উপজেলার মেঘনা নদীর পশ্চিমে ইশানবালায় ৪.৩০০ কিলোমিটার এবং একই উপজেলার আলু বাজার এলাকায় ২.০০ কিলোমিটার।

তিনি আরো জানান, বর্তমান সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত চাঁদপুর পওর বিভাগ নদী তীর সংরক্ষণ কাজ করেছে ১৫.৫৩৯ কিলোমিটার। চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাট এবং হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী কাটাখাল রক্ষা প্রকল্পে ১.৬০০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান আছে।

চাঁদপুর সদরের হানারচর ইউনিয়নের দাক্ষিণ গোবিন্দিয়া মেঘনা পাড়ের ভাঙন এখনো অব্যাহত। ছবিটি সম্প্রতি তোলা।

হানারচর ইউনিয়নের ভাঙন এলাকা দক্ষিণ গোবিন্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম ও সিরাজ হাওলাদার জানান, বর্ষা মৌসুম ছাড়াও নদী পাড় ভাঙন অব্যাহত। ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করছেন কয়েকজন ঠিকাদার। এর মধ্যে অনেকে কাজ করছেন আবার কেউ কাজ ফেলে রেখেছেন। এভাবে কাজ করলে ভাঙন প্রতিরোধ হবে না। আমাদের ঘর বাড়ী আবারও নদী গর্ভে বিলীন হবে। আমরা চাই সরকার যেন মজবুতভাবে নদী তীর সংরক্ষণ কাজ করে।

চাঁদপুর সদরের মেঘান নদীর পশ্চিমে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হজরত আলী বেপারী জানান, আমাদের পুরো ইউনিয়ন পদ্মা ও মেঘনা নদীর ভাঙনের শিকার। এ পর্যন্ত ৬ থেকে ৭ বার ভেঙেছে। এই ইউনিয়নটি সরকার সংরক্ষণ ব্যবস্থা না করলে জেলার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের ইশানবালা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান জানান, ইশানবালার ভাঙনরোধে কয়েকবার পানি উন্নয়ন বোর্ড বালু ভর্তি জিও টেক্সটাই ব্যাগ দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা না হলে কোন কিছুই টিকে থাকবে না।

এদিকে, চাঁদপুর শহরের বিকল্প লঞ্চঘাটের টিলাবাড়ী এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধে গত এক বছরে বেশ কয়েকবার ফাঁটল দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেগুলো বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ দিয়ে প্রতিরোধ করে।

একই অবস্থা শহরের পুরান বাজার বাণিজ্যিক এলাকা এবং হরিসভা মন্দিরসহ দক্ষিণ মেঘনা পাড়। এখানকার অনেক বাসিন্দা তাদের ঘর বাড়ি সরিয়ে অন্যত্র চলেগেছেন। বর্তমানে খুবই ঝুঁকির মধ্যে মন্দিরের পাশে আছেন কৃষ্ণ ঋষি, সুখ রঞ্জন ও নন্দী ঘোষের পরিবার।

কৃষ্ণ ঋষির স্ত্রী বিমলা রাণী বলেন, ভাঙনের কারণে এলাকা ছেড়ে অনেকেই অন্য জায়গায় চলেগেছেন। অন্যত্র যাওয়ার কোন উপায় না থাকায় আমরা ৩ পরিবার খুবই ভয়ের মধ্যে আছি। আমরা সরকারি কোন সাহায্যও পাই না।

মন্দিরের পাশের বাসিন্দা সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত ভাঙন আতংকের মধ্যে থাকি। যে কোন মুহুর্তে নদীর ভাঙন হতে পারে। তখন মন্দির কমপ্লেক্সসহ কোন বসতবাড়িই থাকবে না। ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ীভাবে কোন কাজ হচ্ছে না। ভাঙন দেখা দিলে অস্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এরপর আর খবর থাকে না। আমরা চাই স্থায়ী এবং শক্তিশালী বাঁধ (নদী তীর সংরক্ষণ) নির্মাণ করা হউক। প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের এই কাজটি করেদেন, তাহলে আমরা তাঁর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।

চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ সম্পর্কে পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুর এর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রেফাত জামিল জানান, সর্বশেষ গত ৭ আগষ্ট আমাদের শহর রক্ষা প্রকল্পটি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে- শহর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা হলে এবং মেঘনা নদীর পশ্চিমে ড্রেজিং করা হলে পাশবর্তী এলাকার কোন ক্ষয়ক্ষতি হবে কিনা তা অধিকতর যাচাই করা প্রয়োজন। সে আলোকে এখন আবারও অধিকতর যাচাই বাছাই কাজ চলছে। খুব শীগগীরই আমরা পুন:রায় শহর রক্ষা প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ের জমা দিব।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম