দেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেহেদি

তীব্র আকাঙক্ষা নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বাংলা 

।। মোঃ মহসিন হোসাইন।। মেহেদি হাসান উজ্জ্বল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের বাসিন্দা। সে ভ্রমনপ্রিয় একজন মানুষ। তার এই সৃজনশীল মন মানুষিকতা থেকেই শুরু হয় ভ্রমণ। তার ইচ্ছে ছিল এই ভালো লাগাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভ্রমণের স্মৃতি ধরে রাখা। কয়েকটি জেলা ভ্রমণের পরেই যেন তার নেশা জমে গেল, সবগুলো জেলাই ঘুরতে হবে তার। এসব ভেবেই শুরু হয় ৬৪ জেলা ভ্রমণের গল্প।

জীবনের যেকোনো যাত্রাপথে শুধু গন্তব্য নয়, পথও অর্থবহুল সেটা ভ্রমণই হোক কিংবা হোক নিছক পথচলা। মাঝে মাঝে যেন গন্তব্যের চেয়েও বেশি ভালো লাগে পথের সুবাস। ঠিক যেন ‘জাব উই মেট’ সিনেমার সেই গানটার মতো, ‘হাম যো চালনে লাগে, চালনে লাগে হ্যায় ইয়ে রাস্তে মাঞ্জিল সে বেহতার লাগনে লাগে হ্যায় ইয়ে রাস্তে!’

এই ৬৪ জেলা যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী বলে মনে হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে মেহেদি হাসান উজ্জ্বল বলেন, ‘আমি সত্যিকার অর্থে নিজের ভালো লাগা থেকেই ভ্রমন করা শুরু করেছিলাম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে আমার অভিজ্ঞতা, নানা রকমের মানুষের সঙ্গে মেশা, বিভিন্ন জীবন দর্শন, নানা রকমের ইতিহাস, বিচিত্র ধরনের খাবার- এগুলো নিয়ে জানতে পারার বিষয়টি আমার মধ্যে আজীবন একইভাবে রয়ে যাবে। আমি মনে করি, আমার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কারো যদি ভ্রমণ করার ইচ্ছা হয়, কেউ যদি দেশটাকে নতুন করে জানতে শিখেন, দেখতে শিখেন- তারচেয়ে বড় উপলব্ধি আর কিছুই হতে পারে না। ভ্রমণ আমাদেরকে পুরানো বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। যে দেশে জন্ম থেকে বেড়ে উঠা, সে দেশেরও বহু দিক নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। এমন ভাবনাই প্রকাশ করলেন এই ভ্রমণপ্রেমী মেহেদি হাসান উজ্জ্বল।

তিনি বললেন, ‘আমাদের দেশটা খুব বেশি বড় না, কিন্তু বৈচিত্র্যে দিক দিয়ে কোনো অংশেই কম না! ঝাল খাবারের কথাই ধরুন। আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলের খাবার, খুলনার চুইঝাল, চট্টগ্রামের মেজবান কিংবা পুরান ঢাকার খাবার একেরটার স্বাদ একদমই অন্য রকম। এমন বৈচিত্র্য আছে মানুষের ভাষা, জীবনধারণের প্রকৃতিতেও। একটু একটু করে যখন বিভিন্ন জেলা ঘুরা শেষ হচ্ছিল, আমি নিজেই আবার ভাবতাম এই জেলায় কোনটা আলাদা পেলাম, কোন জিনিসটা অন্য জেলা থেকে ভিন্ন ছিল এসব নিয়ে।’

তবে ভ্রমণকালে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতারও শিকার হয়েছেন তিনি। যাত্রাপথে মানসম্মত খাবার হোটেল না পাওয়া, রাত্রিযাপনের জন্য পরিপাটি হোটেলের অভাব এবং ছিল লোকাল পরিবহন ব্যবস্থার সংকট। মাঝেমধ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও একপাও পিছু হটেননি অদম্য মেহেদি হাসান উজ্জ্বল। তাইতো দেশের সবকটি জেলা ভ্রমণকারীদের নামের পাশে নিজের নামটি তালিকাভুক্ত করেছেন এই ভ্রমণপিয়াসু।

ছোটবেলা থেকে ভ্রমণের চিন্তা আসে তার। তীব্র আকাংক্ষা থেকেই বেরিয়ে পড়েন ভ্রমণে। তিনি বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে পরিগণিত। বিভিন্ন সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, মানুষরে আচার-আচরণ, বিভিন্ন জেলার মানুষরে বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদি জানতে ও শিখতে আমি সবসময় উৎসুক। আমি পুরো দেশকে জানতে চেয়েছিলাম, দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় যেতে চেয়েছিলাম। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে শত-শত পুরাতন ঐতিহাসিক স্থাপনা। এগুলো দেখাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য।

সারা দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ৬৪ জেলার ভ্রমণকালে গিয়েছি জেলার নামের সাথে মিল থাকা ৩৯ টি রেলওয়ে স্টেশনে। অবশিষ্ট ২৫ টি জেলায় মাঝে কিছু জেলায় কোন রেলপথ নাই আর কিছু জেলায় রেলপথ থাকলেও জেলার নামে নিদিষ্ট রেলওয়ে স্টেশন নাই। আমার ভ্রমণের আরেকটা অংশ হিসেবে এই সবগুলো রেলওয়ে স্টেশন গিয়েছিলাম। এছাড়া আরেকটা স্মৃতিময় ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হল বান্দরবান জেলায় আমিয়াখুম জলপ্রপাত দেখতে যাওয়া যেটি দেখতে যাওয়া ইচ্ছে করেও ৪ বছর পর যেতে হয়েছে তাও একবার কাছাকাছি গিয়েও না দেখেই ফিরে আসতে হয়েছে প্রাকৃতিক পরিস্থিতির কারণে আর ৪ বছর লেগেছিল করোনা মহামারী, পাহাড়ি অঞ্চল বিধায় বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ভ্রমণসঙ্গীর অভাব।

তার ভ্রমনের মাধ্যম সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি জানান, বাংলাদশেরে একমাত্র বিমান বাদে সব পরিবহনে আমি ভ্রমন করেছি। যেমন: লোকাল বাস, ট্রেন, রিক্সা, টেম্পু, মোটরসাইকেল, অটোররিক্সা, নৌকা, লঞ্চ সহ ইত্যাদি। এই ভ্রমণের এই তীব্র ইচ্ছা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আমার সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশকে জানতে চেয়েছিলাম, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আরো গভীরভাবে জানতে চেয়েছিলাম, দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো নিজ চোখে দেখতে চেয়েছিলাম কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো একটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। এই সকল কিছু মিলিয়ইে আমার ৬৪ জলো ভ্রমণরে আগ্রহ জন্মে।

অনেকেরই ধারণা, বাংলাদেশে দেখার বেশি কিছু নেই। তিনিও এক সময় এমনটাই ভাবতেন। তবে ভ্রমণে বেরিয়ে এই ভুল ভেঙেছে তার। ঐতিহ্য, ইতিহাস কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পুরো বাংলাদেশটাই যে সুন্দর তা ভ্রমণ করলেই যে কারো চোখে ধরা পড়বে। এতটুকু আয়তনের এক দেশেই যে প্রত্যেকটি জেলার মুখের ভাষা, খাবার, পোশাক, জীবনধারায় নানান বৈচিত্র্য সে ব্যাপারটি বেশ অবাক করেছে তাকে।

ফম/এমএমএ/

ফোকাস মোহনা.কম