দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে পুষ্টি গুণে সমৃদ্ধ লটকন

নরসিংদীতে লটকনের ব্যাপক আবাদ হয়। এ জন্য অনেকে নরসিংদীকে ‘লটকনের রাজ্য’ বলে থাকে। মৌসুমি এই ফলের রাজ্য দিন দিন বড় হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এখন বাণিজ্যিকভাবে লটকনের আবাদ করা হচ্ছে।

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে পুষ্টি ও ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ লটকন। এবার চাষিরা দামও ভালো পাচ্ছেন। নরসিংদীতে এবার ২০০ কোটি টাকার লটকন বিক্রির আশা করা হচ্ছে।

নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলার বেলাব, শিবপুর, মনোহরদী ও রায়পুরা উপজেলায় এক হাজার ৬৭৩ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন, বর্তমানে চাষিরা লটকনের একটু ভালো দাম পাওয়ায় যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। প্রচণ্ড দাবদাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে এবার লটকনের ফলন কম হলেও কৃষকরা মূল্য পেয়েছেন ভালো। এখানকার লটকন খেতে মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়ায় দেশ-বিদেশে চাহিদাও অনেক।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় বাণিজ্যিকভাবে একটি বাগানে লটকন চাষ হচ্ছে। উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের হাতিলেইট গ্রামে ‘কৃষান সমন্বিত কৃষি উদ্যোগ’-এর মালিক আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স বাগানটি করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে বাগানে রয়েছে ৯৪টি গাছ। তিন বছরের মাথায় ফল আসতে শুরু করে। আর এই মৌসুমে প্রায় সব গাছে ভরপুর লটকন হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জেসমিন নাহার বলেন, উপজেলায় একমাত্র লটকনের বাগান রয়েছে হাতিলেইট গ্রামে। কেউ যদি লটকনের বাগান করে, কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী, হলোখানা, রাজারহাটের সদর ও ছিনাই ইউনিয়নে লটকনের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। কুড়িগ্রামে ছোট-বড় মিলে কয়েক হাজার লটকন চাষি। সুপারিবাগানের ফাঁকে ফাঁকে রোপণ করা লটকনগাছে ফল আসছে। এলাকার সফল লটকন চাষি কাঁঠালবাড়ী ইফনিয়নের শিবরাম গ্রামের আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি এই মৌসুমে তাঁর লটকনবাগান আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। একই গ্রামের লটকন চাষি আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, তিনি নিজেই তাঁর বাগানের লটকন দেশের বিভিন্ন স্থানে মোকামে পাঠাচ্ছেন। এই মৌসুমে তিনি তিন লাখ টাকার লটকন বিক্রির আশা করছেন।

বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে। উপজেলায় এ বছর প্রায় ১৮ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হয়েছে। পাকতে শুরু করা লটকন বিক্রিও করছেন চাষিরা। এ বছর কোটি টাকার মতো লটকন বিক্রির সম্ভাবনা আছে। ফলন ভালো হওয়ায় লটকন চাষ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের মধ্যে। কৃষি বিভাগও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার টিলাবেষ্টিত এলাকায় লটকনের ভালো ফলন হচ্ছে। তবে এখনো বাণিজ্যিক বাগান গড়ে ওঠেনি। জানা গেছে, বিয়ানীবাজারের নাটেশ্বর, জলঢুপ, পাতন, মুল্লাপুর, কালাইউরা ও নিদনপুর এলাকার টিলায় লটকনের ভালো ফলন হয়ে থাকে।

সম্প্রতি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার চৈত্যান্য, জয়নগর ও বেলাব উপজেলার লাখপুর, আমলাব ও বটেশ্বর এলাকার কয়েকটি লটকনবাগান ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি বাগানেই আধাকাঁচা ও পাকা লটকন ঝুলছে। অনেক গাছেই গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত অসংখ্য লটকন ঝুলছে। কৃষকরা প্রতিদিনই গাছ থেকে পাকা লটকন বাছাই করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওপর মৌসুমি হাটে নিয়ে বিক্রি করছে।

কথা হয় নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বটেশ্বর গ্রামের লটকন চাষি মো. কাউছার মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, একসময় লটকনের চাহিদা ছিল না বললেই চলে। আর এখন আমাদের দেশসহ বিদেশেও ক্রমেই লটকনের চাহিদা বাড়ছে। তাই এ বছর আমি ১০ বিঘা জমিতে লটকনের আবাদ করেছি। ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এরই মধ্যে দেড় লাখ টাকার মতো বিক্রি করেছি।

লটকনের মৌসুম ঘিরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে জমে উঠেছে বৃহৎ মৌসুমি বাজার। নরসিংদী জেলায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে রায়পুরা উপজেলার মরজাল বাজার ও শিবপুরের চৈত্যান্য বাজারে বিক্রি হয় লটকন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চৈত্যান্য ও মরজাল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত আশপাশের এলাকা থেকে চাষিরা ঝুড়িতে লটকন নিয়ে ভ্যানে করে মহাসড়কের বাজারে ভিড় করছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ও রপ্তানিকারকরা স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে লটকন কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন যার যার গন্তব্যে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার লটকন বিক্রি হয় বলে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে জানা গেছে।

পুষ্টি ও ভেষজ গুণ: টক-মিষ্টি স্বাদযুক্ত লটকন খাদ্যমানের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ। নরসিংদী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. আব্দুল কাফি মিয়া জানান, প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে খাদ্যশক্তি রয়েছে ৯১ কিলোক্যালরি, যা আমলকীর প্রায় পাঁচ গুণ। এ ছাড়া ১.৪২ গ্রাম আমিষ, শূন্য দশমিক ৪৫ গ্রাম স্নেহ, শূন্য দশমিক ৯ গ্রাম খনিজ, দশমিক ০৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, শূন্য দশমিক ১৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ এবং শূন্য দশমিক ৩ মিলিগ্রাম লৌহ আছে। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। রোজ দু-চারটি লটকন দেহের ভিটামিন সি-এর চাহিদা পূরণ করার জন্য যথেষ্ট।-খবর কালের কন্ঠ অনলাইন।

ফম/এমএমএ/

ফোকাস মোহনা.কম