দুই কন্যাকে নিয়ে অসহায় শহীদ আবুল কালাম পরিবার

দুই কন্যার সাথে শহীদ মো. আবুল কালাম। ছবি: সংরক্ষিত।
চাঁদপুর : চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব কাজিরগাঁও গ্রামের বড় বাড়ির মৃত সৈয়দুর রহমানের ছেলে শহীদ মো. আবুল কালাম। পরিবার নিয়ে থাকতেন কুমিল্লায়। পেশায় ছিলেন আইনজীবী। ৫ আগস্ট আদালত থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় গোলাগুলির সময় পিছন দিক থেকে গুলিবিদ্ধ হন। চিকিৎসাধীন থেকে ১৬ আগস্ট তিনি মারা যান। গ্রামের বাড়িতে কোন বসতঘর না থাকায় এখন কুমিল্লায় ভাড়া বাসায় থাকেন। স্বামী হারিয়ে দুই কন্যাকে নিয়ে অসহায় জীবন যাপন এই শহীদ পরিবারের।

মো. আবুল কালাম। জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৬৮খ্রি.। বাবা মৃত সৈয়দুর রহমান। মা মৃত তফুরা বেগম। শহীদ আবুল কালমের ৬ ভাই ৬ বোন। বড় ভাই আবু তাহের (৬৫), মঞ্জুমা (৬১), আব্দুল মান্নান (৫৫), রৌশন আরা (৫৩), শামছুন্নাহার (৫১), আলেয়া সুলতানা (৪৯), শোরাব হোসেন (৪৭), সোহেল হোসেন (৪৫), ফরিদা ইয়াসমিন (৪৩), শাহনাজ (৪১) ও রাসেল হোসেন (৩৯)। সব বোনদের বিয়ে হয়েছে এবং গৃহিনী। ভাইদের মধ্যে ৪জনই ব্যবসায়ী এবং সোহেল প্রবাসী।

শহীদ মো. আবুল কালাম ১৯৮৩ সালে এসএসসি পাস করেছেন হাজীগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। ১৯৮৫ সালে এইচএসসি পায়েলগাছা ডিগ্রি কলেজ এবং ১৯৮৮ সালে বিএ পাশ করেছেন হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে। ১৯৯১ সালে এলএলবি সম্পন্ন করেছেন কুমিল্লা ‘ল’ কলেজ থেকে। ১৯৯৪ সালে তিনি কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সদস্যভুক্ত হন এবং আইনজীবী পেশায় যুক্ত হন।

সম্প্রতি সময়ে এই শহীদের বাড়িতে গিয়ে এবং স্ত্রী ও কন্যাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।

শহীদ আবুল কালামের স্ত্রী ও দুই কন্যা বর্তমানে কুমিল্লা নান্না দীঘির পাড় পূর্ব কর্নার ফাতেমা হোমস্ বাড়িতে ভাড়া থাকেন। বড় মেয়ে নিশাত জাহান মম (২৪) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাপানি স্টাডিজ সোস্যাল সাইন্স বিষয়ে স্নাতকত্তোর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকে অস্থায়ীভাবে চাকরি করেন। ছোট মেয়ে তাছনিয়া অনি চলতি বছর কুমিল্লা মর্ডান স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

শহীদ আবুল কালাম মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদি দক্ষিণ ইউনিয়নের করবন্দ গ্রামে। স্ত্রীর নাম হাসিনা সুলতানা। তার পিতার নাম মৃত মকবুল আহমেদ এবং মায়ের নাম মৃত আনছুরা। ভাই ৩জন। একজন প্রবাসী। বোন ৪জন বিয়ে হয়েছে। সবাই গৃহীনি।

শহীদ মো. আবুল কালাম এর গ্যাজেট নম্বর: ৩৮২ এবং মেডিকেল কেইস আইডি ২২৩৮৯। এই পর্যন্ত জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন ৫ লাখ টাকা। জেলা প্রশাসন থেকে ২ লাখ টাকা, জামায়াতে ইসলামী থেকে ৫০ হাজার টাকা। বিএনপি কোন খোঁজ নেয়নি। হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুদান দিয়েছে ১০ হাজার টাকা। সর্বশেষ জুলাই ফাউন্ডেশনের ১০লাখ টাকা সঞ্চয়পত্র পেয়েছেন।

শহীদ কালামের স্ত্রী ও মেয়েরা জানান, তিনি ৫ আগষ্ট আদালত থেকে বাসায় ফেরার সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সড়কে এসেই গোলাগুলির মধ্যে পড়েন। ওই সময় তার পিছন দিকে মেরুদন্ডে গুলি লাগে। সেখানে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সহকর্মী আইনজীবীরা প্রথমে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্স করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা পপুলার হাসপাতালে। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা চলে ৪দিন। অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে রাখা হয়। ১৬ আগস্ট তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়।

এদিকে ১৬ আগষ্ট কুমিল্লা জজ আদালত প্রাঙ্গনে বাদ জুমআ এই শহীদের প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ওই দিন বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বাদ আছর বাড়ির পাশের মসজিদের সামনে দ্বিতীয় নামাজে জানাযা শেষে বাবা-মায়ের পাশে পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হয়।

স্ত্রী হাসিনা সুলতানা বলেন, তার স্বামী খুবই সহজ সরল ছিলেন। আন্দোলনের শুরু থেকে তিনি আহত এবং নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের পক্ষে থেকে আইনী সেবা দিয়েছেন। তিনি কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির দুইবার নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, ১৯৯৯ সালে বড় মেয়ে এবং ২০০৮ সালে ছোট মেয়ের জন্ম হয়। এরপর থেকে খুবই কষ্টের মধ্যে থেকে সংসার চালিয়েছেন। তিনি বলতেন মেয়েরা যেন পড়ালেখা করে মানুষের মত মানুষ হয় এবং তার স্বপ্ন পুরণ করে। তিনি মারা যাওয়ার পরে খুবই অসহায় হয়ে পড়েছেন। অভিভাক ছাড়া দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন। বাড়িতে জমি থাকলেও বসতঘর নেই। তিনি বড় মেয়ের কর্মস্থল এবং ছোট মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

মেয়ে নিশাত জাহান মম বলেন, বাবার স্বপ্ন ছিলো আমি বিসিএস ক্যাডার হব। বাবার স্বপ্ন পুরণ করার জন্য আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।

ছোট মেয়ে তাছনিয়া অনি বলেন, বাবা নেই এখনো মানতে পারছি না। বাবার শূন্যতা আমাকে খুবই বেদনা দেয়। কারণ আমার সকল চাওয়া-পাওয়া ছিলো বাবার কাছে। বাবার স্বপ্ন ছিলো আমি আইনজীবী হই। সবার সহযোগিতা থাকলে বাবার ইচ্ছে পুরণ করতে পারবো।

শহীদ কালামের চতুর্থ ভাই শোয়েব হোসেন বলেন, ভাই কুমিল্লা থাকলেও যে কারো বিপদে এগিয়ে আসতেন। এলাকার গরীব মানুষদের খোঁজ খবর নিতেন। এলাকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সব সময় কাজ করতেন। আমরাও চেষ্টা করবো ভাইয়ের এই কাজ অব্যাহত রাখতে।

এই শহীদের সাথে সবচাইতে বেশি সখ্যতা ছিলো ছোট ভাই আবু সালাত রাসেলের সাথে। ভাইয়ের সাথে নিয়মিত কথা হতো। গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার সময় তার নিকটে ছিলেন রাসেল।

তিনি বলেন, বাবা-মা বেঁচে থাকা অবস্থায় সব সময় ভাই খোঁজ খবর নিতে। কখন কী লাগবে এই নিয়ে অস্থির থাকতেন। আমাকে বলতেন-কথা কম বলবে, শুনবে বেশি। শেষ মুহুর্তে আমাকে হাসপাতালে থেকেও আমাকে সর্তক হয়ে চলার জন্য বলেন। ভাই অচিয়ত করেন বাবা-মায়ের পালে নীচে কবর দিতে। তার সেই অচিয়ত পুরন করেছি।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম