জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর

।। মোঃ মহসিন হোসাইন ।। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি সন্তান শেখ মুজিব। তিনি বাঙালি জাতির জনক। তাঁর দূরদর্শী ও ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে একটি পরাধীন জাতি পায় স্বাধীনতার স্বাদ। বহু বছরের শোষণ-দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি গড়ে তোলেন সমৃদ্ধিশালী, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। একটি অবহেলিত ভূখণ্ডের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা অর্জন করার মতো নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই বিরল নেতা। সক্রেটিসের যোগ্য শিষ্য প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের যেসব গুণের কথা উল্লেখ করেছেন শেখ মুজিবের মধ্যে সেসব গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। শেখ মুজিব আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, প্রজাপ্রেমী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। যে মানুষটি কখনোই বাঙালিকে অবিশ্বাস করেননি, শত্রু ভাবেননি, সেই শুদ্ধ চিত্তের মানুষটিকেই কয়েকজন স্বার্থপর-ঘাতক সপরিবারে হত্যা করল- যা শুধু বাঙালির ইতিহাসেরই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও একটি কলঙ্কজনক ঘটনা বলে বিবেচিত। আর সেই দিনটি হচ্ছে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সাল। রক্তাক্ত ৩২ নম্বর ধানমন্ডি। শোকে কয়েক দশক ধরে কাঁদছে বাঙালি জাতি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ডই নয়, একটি স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক জাতিকে পরাধীন ও সাম্প্রদায়িক করার পাশবিক চক্রান্তও বটে। আমরা যদি মুজিব হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রগুলো বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব- একটি স্বাধীন জাতিকে মূলত তারাই ধ্বংস করতে চায় যারা সাম্রাজ্যবাদের পূজারী বা সাম্রাজ্যবাদের মদদদাতা। সুতরাং যারা সাম্রাজ্যবাদী এবং যারা সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক তারাই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনাকারী হতে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নকারী পর্যন্ত সবাই অপরাধী, সবাই মুজিব হন্তারক।

সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে সে সময় জাতি এই জঘন্যতম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার হতে পারেনি ঠিকই, তবে তা যে মেনে নিতে পারেনি সেটাও সত্য। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী শাসকেরা এই নির্মম হত্যাকান্ডকে ধামাচাপা দেয়ার ঘৃণ্য প্রয়াস চালিয়েছে। ‘ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ করার হীন ষড়যন্ত্র চালিয়েছে। ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার আদর্শই শুধু নয়, স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করারও ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছে। এতে করে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন এতে সন্দেহ নেই। সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় জাতি বঙ্গবন্ধুর ন্যায় নেতৃত্বের অভাব গভীরভাবে অনুভব করেছে। কিন্তু তার প্রকাশ ঘটাতে সময় লাগে দীর্ঘ একুশ বছর। অবশেষে মানুষের গণতান্ত্রিক বিজয়ে আবারও বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে। তার ধারাবাহিক নেতৃত্বে এখন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ পূরণে এগিয়ে চলেছে অব্যাহত গতিতে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। গ্রেফতারকৃত খুনীদের সর্বোচ্চ শাস্তিও হয়েছে। পলাতকদের ফিরিয়ে এনে সাজা দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। বাঙালি জাতি সেদিনের অপেক্ষায় আছে। খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এর পুনরাবৃত্তি রুখতে পারে বলে সবার বিশ্বাস। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা বসে নেই। ঘরে-বাইরে তাদের একের পর এক অপপ্রয়াস বানচাল করেই ২০১১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছে জনগণ। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সফলতার পর আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির দিকেই এখন সবার দৃষ্টি। এবারের জাতীয় শোক দিবসে সমগ্র জাতি নতুন করে শপথ নেবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করতে শোকের পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিতে বলিয়ান হয়েই এগিয়ে যেতে হবে জাতিকে। মুক্তিযুদ্ধের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকারই হোক আজকের দৃপ্ত শপথ।

মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর সমগ্র বাংলাদেশ থমকে গিয়েছিল। বজ্রাহত মানুষের মতো অসাড় হয়ে গিয়েছিল বাংলার শোকাহত মানুষ। ঘনিষ্ঠ স্বজন মারা গেলে মানুষ যেমন বাকরুদ্ধ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়, মুজিব হত্যার ঘটনায়ও পুরো বাঙালি জাতি শোকে-দুঃখে পাথর হয়ে গিয়েছিল। মানুষ এখন সেই অবশ মুহূর্তগুলোর কথা ভুলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করছেন, তাঁর নামে স্তুতি-স্তব করছেন, এটাই এখন ইতিহাস।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কয়েক হাজার কবিতা লেখা হয়েছে বলে অনুমান করি। জানামতে, দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। দেশের বাইরে কলকাতার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কবিও লিখেছেন। কবিদের পাশাপাশি মনীষ ঘটক, শওকত ওসমান, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, সেলিনা হোসেনের মতো খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিকও বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে কবিতা রচনা করেছেন। তাই এটা জোর দিয়েই বলা যায়, বিশ্বে এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নেই, যাকে নিয়ে রচিত হয়েছে এত বিচিত্র কবিতা! কেন এত কবিতা রচিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে? এ প্রশ্নের জবাব খুবই সহজ। বঙ্গবন্ধু এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; যার দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা, প্রজ্ঞা, বাগ্মিতা, নেতৃত্বগুণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, রসবোধ ইত্যাদি তাকে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। এমন একজন রাষ্ট্রনায়ককে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাও সংবেদনশীল কবিদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফলে বেদনাহত কবিকুল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেছেন বহু মর্মস্পর্শী কবিতা।

১৯৬৯ সালে আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় জেলবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। ওই সভায় সে সময়ের ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কবি জসীমউদ্দীন ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতাটি রচনা করেন। সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এটি দ্বিতীয় কবিতা। কবিতাটির সূচনা পঙ্গিক্তমালা উদ্ধৃত করছি-

মুজিবুর রহমান

ওই নাম যেন ভিসুভিয়াসের অগ্নি উগারি বান।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে,
জ্বালায় জ্বলিয়ে মহাকালের ঝঞ্ঝা অশনি বেয়ে;
বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা যার,
হৃদয়ে হৃদয়ে সি ত হয়ে সহ্যের অংগার
দিনে দিনে হয় বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে
দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান দিল প্রকাশের মুখে
তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি
ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি,

ভারতের প্রথিতযশা উর্দুভাষী কবি ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব কাইফি আজমি ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক যে কবিতাটি রচনা করেন, সেখানেও উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বীরগাথা। ভারতের আরেক কালজয়ী চিন্তানায়ক ও মানবতাবাদী সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে রচনা করেন অমর পঙ্গিক্তমালা-

যতকাল রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।

দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা
রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয় হবে হবে জয়।
জয় মুজিবুর রহমান॥

কবি শামসুর রাহমান তার ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে লিখেছেন : ‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করার পর নিদারুণ বৈরী পরিবেশে প্রথম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের কণ্ঠে। কেননা, ‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত’ বঙ্গবন্ধু এ দেশের কবি-সাহিত্যিকদের চেতনালোকে সাংঘাতিক আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন। বাংলা ভাষার কবিদের কলম দিয়ে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অসামান্য সব কবিতা।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজন প্রতিবাদী তরুণ প্রকাশ করেন একটি কবিতা-সংকলন। সংকলনটির শিরোনাম ছিল- ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়?’ এটি প্রকাশ হয় ১৯৭৮ সালে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এটিই ছিল প্রথম সংকলন। এ দুঃসাহসিক সংকলনের পরিকল্পনা করেছিলেন ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু। সংকলনে মোট ত্রিশটি কবিতা ছাপা হয়েছিল এবং সম্পাদক হিসাবে কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অজ্ঞাত সংগঠন ‘সূর্য তরুণ গোষ্ঠী’র নামে সংকলনটি প্রকাশ হয়। ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ সংকলনটি যখন প্রকাশ হয়, তখন ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার মতো মানুষ ছিল হাতেগোনা। ওই সংকলনে তরুণ কবি কামাল চৌধুরী ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ শিরোনামে অনন্যসাধারণ এক কবিতা রচনা করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতার একটি বই প্রকাশ করেন। ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ কবিতাটির প্রথমাংশ উপস্থাপন করছি-

এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী
ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি
হেরিতে এখনও মানবহৃদয়ে তোমার আসন পাতা
এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা-পিতা-বোন-ভ্রাতা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সোনার বাংলা চেয়েছিলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। সেই পিতাকেই পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ভোরে। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা চেয়েছিল বাংলার মাটি থেকে চিরতরে পিতার নাম মুছে ফেলতে। কিন্তু তাকে বাংলার মাটি থেকে, বাঙালির মনন থেকে মুছে ফেলা যায়নি। দেশের কোনো-না-কোনো প্রান্তে প্রতিমুহূর্তে জাতির জনকের মুখ আঁকা হচ্ছে বাংলাভাষার কোনো-না-কোনো কবির কলমে শব্দে ও ছন্দে।

আমি মনে করি জাতীয় শোক দিবসের তাৎপর্য তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন আমরা এটি সদ্ব্যবহার করব। শোক দিবসে কান্না-হাহাকার নয়, বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করাই হওয়া উচিত শোক দিবসের মূল লক্ষ্য।

লেখক পরিচিতিঃ
মোঃ মহসিন হোসাইন
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
সভাপতি- মানবতার ডাক সাহিত্য পরিষদ।

ফোকাস মোহনা.কম