জীবনের দৃশ্য (ছোটো গল্প)

—কবি ও লেখক মোঃ সালাহউদ্দিন হাজরা
তালহাঃ এই আরমান কেমন আছিস?
আরমানঃ ভালো। তালহা তুই কেমন আছিস?
তালহাঃ ভালো। তো আরমান তুই কোথায় যাচ্ছিস?
আরমানঃ গায়ে পাঞ্জাবি বুঝতে পারছিস না, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি।
তালহাঃ আরে আমিও তো পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি।
আরমানঃ তো চল দুজনে এক সাথে যাই।
তালহাঃ আরমান চাঁদপুরে পহেলা বৈশাখের মজাটাই আলাদা। প্রেস ক্লাবের পিছনে নদীর তীরে বিস্তীর্ণ মাঠে সুন্দর একটি পরিবেশে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানটি হয়।
আরমানঃ তালহা তুই ঠিকই বলেছিস নদীর উম্মুক্ত হাওয়ায় শরীর মন শীতল হয়ে যায়।
তালহাঃ আরমান আমরা সঠিক টাইমেই এসেছি। অনুষ্ঠান শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। এখনই শিল্পীরা গান শুরু করবে।
আরমানঃ তালহা চল আমরা ঐ দিকটায় গিয়ে বসি।
তালহাঃ আচ্ছা আরমান বলতো পহেলা বৈশাখ কবে এবং কিভাবে চালু হয়?
আরমানঃ হুম খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছিস তালহা। ফসলের খাজনা আদায়ের পর নতুন হিসেবের খাতা খোলা, যা হালখাতা নামে পরিচিত। এই হালখাতাকে কেন্দ্র করে মিষ্টিমুখ করানো হতো। চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত খাজনা আদায়ের সময় নির্ধারিত ছিল। এই হালখাতাকে ঘিরেই আজকের পহেলা বৈশাখের জন্ম হয়। সম্রাট আকবরের আমলে পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি হয়েছে।
অনিহাঃ দুঃখিত আমি কি এখানে বসতে পারি?
কথা শুনে দুই বন্ধুই চুপ হয়ে গেলো। পুনরায় মেয়েটি আরমানকে জিজ্ঞাসা করে,
“আমি কি আপনার পাশের খালি চেয়ারে বসতে পারি?”
 আরমানঃ হ্যাঁ বসুন।
অনিহাঃ আমি অনিহা। ইংলিশে অনার্স পড়ছি, তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।
আরমানঃ আমি আরমান আর আমার পাশে আমার বন্ধু তালহা। আমরা দুজনেই ইতিহাসে মাস্টার্স করছি।
অনিহাঃ আমি আপনাকে আগে থেকেই চিনি। আপনি গল্প, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, লেখেন। আমি আপনার লেখা গুলো নিয়মিত পড়ি। আমার কাছে খুবই ভালো লাগে আপনার লেখাগুলো পড়তে। সত্যি বলতে আপনি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখেন, যার কারণে আপনার লেখাগুলোর প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করি।
আরমানঃ ধন্যবাদ আপনাকে আমিতো শুধু ফেইসবুকে লিখি আর কোথায়ও লিখি না। তো আপনি কিভাবে পড়লেন?
অনিহাঃ ফেইসবুক, ম্যাগাজিন কিংবা পত্র-পত্রিকা যেখানেই লেখেন, লেখার মান যদি ভালো থাকে, পাঠক আপনাকে খুঁজে নিবে। আসলে আমি আপনার ফেইসবুকের একজন ফ্রেন্ড। আপনি আমাকে চিনবেন না। কারণ আমার আইডিটি ফেক আইডি। যেহেতু মেয়ে মানুষ। তাই নানা ধরনের ঝামেলা এড়ানোর জন্য ফেক আইডি খুলেছি।
আরমানঃ ঠিক আছে। তবে ফেক আইডি সম্পর্কে যে যুক্তি দিলেন, তার সাথে আমি একমত নই। কারণ সমস্যা হতে পারে ভেবে ফেক আইডি তৈরি করে রাখা যুক্তিসংগত সমাধান নয়।
অনিহাঃ সরি।
পহেলা বৈশাখের গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। তালহা বাদাম কিনে নিয়ে এলো। সবাই মিলে বাদাম খাচ্ছে এবং গান নাচ উপভোগ করছে।
অনুষ্ঠান শেষে অনিহা বলল,
“আরমান ভাই আজই আমার আইডিটা এডিট করবো।”
পরে দু‘জন দু‘জনকে মোবাইল নাম্বার দেয় এবং একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেয়।
আরমান ভাবতেছে, সে বোধ হয় এতটা সময় একটা কল্পনার ভিতর ছিল। এতো সুন্দর মেয়ে বোধ হয়, সে কখনো দেখেনি। অথচ তার সাথে এতো স্বাভাবিকভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছে, ভাবতেই আরমান অবাক হয়ে যায়।
তালহাঃ আরমান তোর সাথে অনিহার কত দিনের সম্পর্ক। সত্যিই অনিহার চেহারা খুব সুন্দর এবং অসাধারণ কণ্ঠস্বর যার তুলনা হয় না।
আরমানঃ কেন? তোর সামনেই তো নিজের এবং তোর পরিচয় দিলাম অনিহার কাছে। তাহলে কেন বলছিস কত দিনের সম্পর্ক। আমি আজকেই ওকে প্রথম দেখলাম।
তালহাঃ দোস্ত হয়তো এটাই তোর জীবনের একটি চরম মুহুর্ত হয়ে থাকবে। হয়তো জীবনের নতুন কোনো দৃশ্য আঁকবে।
আরমানঃ তাই নাকি?
আরমান বিদায় নিয়ে বাড়িতে আসে। তাদের বাড়িটি ওয়্যারলেস বাজারের কাছে। চাঁদপুর শহর থেকে আসতে দশ টাকা ভাড়া লাগে।
সন্ধ্যার দিকে আরমান ফ্রেশ হয়ে রুমে ঢুকে। নিজের পড়াশুনা শেষ করে মোবাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে।আরমানের নিজের দুটি ফেইসবুক আইডি আছে এবং একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে। অবসর সময়ে এগুলোর মধ্যে সময় কাটায়।
আরমান নিজের ফেইসবুকে ঢুকে তার ফ্রেন্ডলিষ্ট চেক করে।
আরমানঃ হ্যাঁ এইতো মেয়েটির আইডি পেয়েছি।
আরমান এক মুহুর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে ভাবলো,
“কিছু কিছু বাস্তবতা কল্পনাকেও হার মানায়।”
আরমান অনিহাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখে,,,,,,,,,,,,,
শাড়িতে তুমি অসম্ভব সুন্দরী
বাংলার নয়নমণি,
উদাস দুটি চোখে ছিল
মায়া ভরা চাহনি।
ভীষণ মগ্ধ হয়ে বার বার
দেখছিলাম মুখখানি,
নিরব এখানে কবির বাণী
তৃপ্ত মোর হৃদয় খানি।
নদীর প্রবল হাওয়ায়
দুলছিল তোমার চুল,
মন চেয়ে ছিল গেঁথে দেই
একটি লাল জবা ফুল।
নিমিষে মন গেলো ভরে
সুবাস গেলো ছড়িয়ে,
অবাক হলাম  সময়টা
শেষ হল কখন গড়িয়ে।
আরমান প্রতিদিনের মতো আজও কলেজ শেষ করে বাসায় ফিরলো, সে অনিহাকে দেখে অবাক হয়ে গেলো।কিছু বুঝে উঠার আগেই আরমানকে তার বোন বলল,
“ভাইয়া ও আমার ক্লাসমেট অনিহা।”
আরমানকে দেখে অনিহা অবাক হয়ে যায়।
বোনের অনুপস্থিতিতে আরমান অনিহাকে বলল,
“মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি,
আহা! কি সুন্দর সৃষ্টি।”
অনিহাঃ বৈশাখ মাসে বৃষ্টি এটাইতো স্বাভাবিক,
প্রকৃতি সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়েছে চারিদিক।
আরমান ও অনিহা দুজন মিলে নানান প্রসঙ্গ নিয়ে গল্প করলো।
আরমানের বোন নদীয়া এসে বলল,
“চল অনিহা আমি রেডি।”
আরমানঃ কোথায় যাবি নদীয়া?
নদীয়াঃ ভাইয়া তুমি যেতে চাইলে, আমাদের সাথে যেতে পারো। আমরা পহেলা বৈশাখের মেলাতে যাচ্ছি।
আরমানঃ না আমি যাবো না। তবে দেরি করিস না।
নদীয়াঃ ওকে ভাইয়া।
নদীয়া এবং অনিহা মেলার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
আরমান ফ্রেস হয়ে কিছু সময় বিশ্রাম নেয়। সন্ধ্যার দিকে নদীয়া এবং অনিহা বাসায় ফিরে আসে। নদীয়া আরমানকে বলল,
“ভাইয়া অনিহাকে একটু ওদের বাসায় পৌঁছে দাও।”
আরমানঃ ওদের বাসা কোথায়?
নদীয়াঃ তোমার ফেইসবুকের বন্ধু তুমি জানো না?
আরমানঃ আসলে নদীয়া আমার দুটো আইডি। একটিতে যাদেরকে আমি চিনি তারাই শুধু আমার বন্ধু আর অন্যটিতে যে কেউ বন্ধু হতে পারে। তবে শর্ত হচ্ছে অবশ্যই তার আইডিটি মান সম্পন্ন হতে হবে।
নদীয়াঃ বুঝতে পেরেছি ভাইয়া, এমনি তোমার সাথে মজা করলাম। অনিহা আমাকে তোমার সম্পর্কে সব বলেছে। আমাদের মহল্লার শেষ মাথায় অনিহাদের বাসা।
 আরমানঃ এর আগেতো কখনো ওকে দেখিনি।
নদীয়াঃ ওরা অন্য এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকতো।
আরমান অনিহাকে নিয়ে ওদের বাড়ির দিকে চললো।অনিহা পথে আরমানকে একটি ঘড়ি দিয়ে বলে,
“ভাইয়া এটা আপনার জন্য কিনেছি, নিন।”
আরমানঃ এটা কেন?
অনিহাঃ বন্ধু বন্ধুকে দিতেই পারে, তাই নয় কি?
আরমান কিছুটা লজ্জিত হল। আরমান অনিহাদের বাড়িতে ঢুকে অবাক হয়ে গেল। আলিশান বাড়ি, সুন্দর গাড়ি। বুঝতে পারলো অনিহার বাবা অনেক বড়লোক।
অনিহা তার বাবা-মার সাথে আরমানের পরিচয় করিয়ে দেয়। আরমান তাদের সাথে কথা বলে কিছুটা সময় কাটায় এবং সবাই মিলে হালকা নাস্তা করে। নাস্তা শেষে আরমান বিদায় নেয়।
আরমান ভাবলো। জীবন কি এমনই সুন্দর হয়। সুখ সুখ অনুভূতি নিয়ে বাসায় ফিরলো। আরমান নিজের রুমে গিয়ে রুটিনমাফিক পড়াশুনা শেষ করে।
আরমানের মোবাইলটি হঠাৎ বেজে ওঠে। আরমান অনিহার মোবাইল নাম্বার দেখে অবাক হয়ে যায়। মোবাইল ধরতেই অনিহা বলে উঠে,
“আপনি তো আমার অনেক বড় সর্বনাশ করে ফেলেছেন।”
আরমান কি বলবে বুঝতে পারছিল না।
অনিহাঃ জানেন আপনাকে আমাদের বাড়ির সবাই পছন্দ করেছে। বাবা-মা ধরে নিয়েছে আপনার সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে। আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে আপনার সম্পর্কে। আমি তাদেরকে কিছুই বলিনি। আপনিই বলুন আমি তাদেরকে এখন কি বলবো।
আরমানঃ যা সত্য তাই বলুন।
অনিহাঃ সত্যটাতো আগে আপনাকেই জানাতে হয়।
জানেন আপনার লেখা পড়ে, কখন যেন অজান্তেই আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এখন বলুন আপনি, বাবা মাকে সত্যটা কি বলবো?
আরমানঃ আকাশের চাঁদকে ভালোবাসে না এমন লোক কি আছে? তুমি ঐ দূর আকাশের চাঁদের ন্যায় আমার কাছে।
আরমান এবং অনিহার ভালোবাসা চলতে থাকে।
দুজনে মিলে রঙবেরঙের স্বপ্ন আঁকে।
পারিবারিকভাবে একদিন দু’জনের বিয়ে হয়। বিয়ের দু’বছর পর এক মেয়ে এবং ছয় বছর পর যমজ ছেলে হয় অনিহার।
সুখে শান্তিতে চলতেছিল অনিহা এবং আরমানের দাম্পত্য জীবন।
দুজনেই কলেজের প্রভাষক। তাই তাদের মধ্যে বোঝাপড়ার কোনো ঘাটতি ছিল না।
হঠাৎ করে একদিন অনিহা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তাররা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে অনিহার ব্লাড ক্যান্সার।
ধীরে ধীরে অনিহা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে।একদিন সকল সুখ ত্যাগ করে অনিহা মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করে।
অনিহার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আরমান দু’হাত তুলে দোয়া করছে আর কাঁদছে।
পিছন থেকে নদীয়া এসে বলল,
“ভাইয়া তোমার দুটি ছেলে এবং একটি মেয়ে আছে, তুমি যদি ভেঙ্গে পড়, তাহলে এদেরকে কে দেখবে?”
 মনে মনে আরমান অনিহাকে বলল,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
“কেন তুমি চলে গেলে আমায় কাঁদিয়ে,
এই অসীম দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে।
পারছি না তোমাকে ছাড়া থাকতে,
বার বার ফিরে আসি তোমাকে দেখতে।
গভীর ঘুমে শুয়ে আছো আমাকে ভুলে,
জ্বলছি আমি বিরহের আগুনে এ কূলে।
খুব ভালো থেকো তুমি পরপারে,
দোয়া করি স্রষ্টার কাছে প্রাণ ভরে।”
হঠাৎ আরমানের ঘুম ভাঙে তার মনে পড়ে পহেলা বৈশাখ তো অনেক আগে চলে গেছে তাহলে তালহাকে
নিয়ে এতক্ষণ সে যা দেখেছে তা ছিল পুরোটাই স্বপ্ন আর হ্যাঁ অনিহা নামের কাউকে তো সে চিনেই না কখনো দেখেও নি। কলিং বেলের আওয়াজ কানে আসতেই আড়মোড়া দিয়ে দরজা খুলে আরমান। দরজা খুলতেই আরমানের চোখ কপালে উঠে যায়। নিজের চোখকে সে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। সাক্ষাৎ স্বপ্নের মেয়ে অনিহা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনিহা সালাম দিয়ে বলে, আমরা আপনাদের প্রতিবেশী এটা আমার বিয়ের কার্ড। আরমান বোবা হয়ে যায় এবং তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠে। কার্ডটি যেন তীর হয়ে তার বুকে বেঁধে। স্বপ্ন আর বাস্তবতায় আরমান বাকরুদ্ধ।
(বিঃ দ্রঃ এটি একটি কল্পিত কাহিনী)
ই-মেইলঃ mdsalahuddin2018@gmail.com
মোবাইলঃ ০১৭৮৫৯৯১৫৭৪, ০১৮৮৪১৭৩০৩০

ফোকাস মোহনা.কম