চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় ১৪তম দি‌নে স্মৃ‌তিচারণ

চাঁদপুর: মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার ১৪তম দিবসে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠিত হয়ে‌ছে। 
বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর)  সন্ধ্যায় স্মৃতিচারণ পরিষদের ব্যবস্থাপনায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃ‌তিচার‌নে চাঁদপুর  জেলা মু‌ক্তিযোদ্ধা সংস‌দের  সহকা‌রি কমান্ডার ও মু‌ক্তিযু‌দ্ধের বিজয় মেলা উদযাপন প‌রিষ‌দের সাবেক চেয়ারম‌্যান বীর মু‌ক্তি‌যোদ্ধা মহ‌সিন পাঠানের সভাপ‌তি‌ত্বে প্রধান আলোচক হি‌সে‌বে বক্তব‌্য রা‌খেন  চাঁদপুর  জেলা মু‌ক্তিযোদ্ধা সংস‌দের সা‌বেক কমান্ডার বীর মু‌ক্তি‌যোদ্ধা শাহাদাত হো‌সেন সাবু পাটওয়ারী।
এ সময় তিনি বলেন,  ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। তখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্র। গণ আন্দোলন  শুরু করে বাংলাদেশের ৭০ এ নির্বাচনে আমি ভোটার হই। ৭০ সালে নির্বাচনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের নির্বাচন তারা স্বীকৃতি দিতে অনিহা প্রকাশ করে। বঙ্গবন্ধু বারবার স্বীকৃতির জন্য তাদেরকে আনতে না পেরে সাত মার্চ রেসকোস  ময়দানে জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, আমার বাড়ি ফরিদগঞ্জের পাইকপাড়া হাইস্কুলের পাশে পাটোয়ারী বাড়ি। আমাদের শিক্ষক মরহুম সিরাজুল ইসলাম  বিএসসি স্যারের নেতৃত্বে আমরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে তিনি আমাদের ডেকে নেন স্কুল মাঠে। তিনি আমাদেরকে বলেন যুদ্ধ করতে হবে লেখাপড়া করার এখন আর সময় নেই। অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশ মাতৃকা যেন আমাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে । তখন তিনি আমাদের নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করলেন।  ক্যাপ্টেন জহিরুল হক পাঠান আমাদের প্রশিক্ষণ দেন। কলিমুল্লা ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আমরা একত্রিত হই। সারা বাংলাদেশের সংগ্রাম কমিটি করা হয়েছিল।
আমাদের এলাকায় সংগ্রাম কমিটির গঠন করা হয়। ফরিদগঞ্জের ৫ জনকে তখন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হল। একমাস প্রশিক্ষণ নিলাম। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে আটক করে পাকিস্তানে নিয়ে  যায়। আমরা অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করি লাঠি দিয়ে, তারপরে অস্ত্র দিয়ে শুরু হয় মূল প্রশিক্ষণ । আমরা জানতে পারি হাজিগঞ্জ হয়ে ফরিদগঞ্জে পাকিস্তানিরা প্রবেশ করছে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলো। পাকিস্তানিরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ফরিদগঞ্জে আক্রম শুরু করে। পাইকপাড়া স্কুল মাঠে প্রায় দেড়শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আক্রমণের জন্য পাকিস্তানিরা  প্রস্তুতি নিচ্ছে সেই খবর আমরা  পেয়ে যাই। আমাদের বাড়ির পাশে একটি সাঁকো ছিল।
আমরা প্রস্তুতি নিলাম সাঁকো ভেঙে দেবো। সেই পাইকপাড়া স্কুলে আক্রম শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের  ক্যাম্পে তারা গুলি বর্ষণ  শুরু করে। আমাদের সংগ্রাম কমিটির সভাপতি রব সাহেবের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তারা যখন ফরিদগঞ্জের দিকে প্রবেশ করল আমরা তাদের পেছন  থেকে আক্রম শুরু করি। আমরা সুবেদার রব সাহেবের কমান্ডারের নির্দেশে যুদ্ধ করেছি। জহিরুল হক পাঠানের নির্দেশে পাকিস্তানিদের উপর আক্রমন শুরু করি। আমাদের ধাওয়া খেয়ে পাকিস্তানিরা ফরিদগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়। সেদিনই আমাদের প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। মরহুম আব্দুল করিম পাটোয়ারী, এম শফিউল্লাহ, আবু জাফর মাইনুদ্দিন,  আমাদের পাইকপাড়া ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। তিন চার মাস আমরা যুদ্ধ করলাম নিজ এলাকাতে।  আমরা আমব্রোসের মাধ্যমে প্রস্তুতি  নিয়ে রেখেছিলাম। আমরা একটি রাইফেলের আওয়াজ করলে তারা কয়েকশ রাউন্ড গুলি ছাড়তো। পুরো গ্রামবাসী যখন মুক্তিযোদ্ধারের সাথে একত্রিত হয়ে পাকিস্তানিদের উপর হামলা করলো তখন ২৩ জন পাকিস্তানি মারা গেল। আমিনুল হক মাস্টার আমাদের ১০ জনকে ভারতের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিলেন নৌকা যুগে। অপরা একটি নৌকা যোগে কলিমুল্লা ভূইয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে রওনা দিলেন। কৈয়ারপুল নামক স্হানে  কলিমুলা ভূইয়া নৌকাটি থামান। তিনি প্রশিক্ষণে যাওয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের বলেন আমি সামনে গিয়ে দেখি পাকিস্তানি বা রাজাকার কেউ আছে কিনা। কিছু দূর যাওয়ার পর দুই রাজাকার তাকে থামিয়ে দেয়। তখন কলিমুল্লাহ ভূইয়া চাদরের নিচ থেকে অস্ত্র বের করে রাজাকারদের থামিয়ে দেয়। এত রাতে আমাদের নৌকা চলতে থাকলো। কোন পথে যাচ্ছি কোথায় যাচ্ছি আমরা জানি না। নৌকা আর হেঁটে আমরা ভারতে গিয়ে উঠলাম।ভারতের সেনা আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়। যখন আমরা গোমতী নদী পার হই এপারে বড় দুটি নৌকা বাঁধা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পার করার জন্য। কংগ্রেস ভবনে আমরা রিপোর্ট করার পর আমাদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হলো বিহারের শালবন  ক্যাম্পে। আমাদের সাথে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখন বেঁচে নেই। ৩০ লক্ষ শহীদ আর দুই লাখ মা বোনের ইজ্জতের  বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীনতা। 
চাঁদপুর  জেলা মু‌ক্তিযোদ্ধা সংস‌দের  সা‌বেক ডেপু‌টি কমান্ডার বীর মু‌ক্তি‌যোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বরকন্দাজ বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে  তিনি বলেন ১৯৭১ সালে মহান মু‌ক্তিযু‌দ্ধে দে‌শের সা‌ড়ে ৬ কো‌টি মানুষই যু‌দ্ধে অংশ নি‌য়ে‌ছিল। রনাঙ্গ‌ণে সক‌লে না গে‌লেও সেময় দে‌শের সকল মু‌ক্তিকামী মানুষ যু‌দ্ধে প্রত‌্যক্ষ ও পরোক্ষোভা‌বে অংশ নেয়।
আসামে গি‌য়ে আ‌মি একমাস ট্রেনিং ক‌রি। এরপর লোহাগরে আর্মস এনু‌মেশন নি‌য়ে ভারত থে‌কে আ‌সি। হাইমচর চাঁদপুর ও শাহরা‌স্তির ১০৪ জন আর্মস নি‌য়ে বাংলা‌দে‌শে আসি। আমরা ট্রেনিং ক‌রে মাত্র এ‌সেছি সেসময় দে‌শে ঢুকতেই পা‌কিস্তানী বা‌হিনী গুলিবর্ষন ক‌রে তা‌তে আমা‌দের ৪ জন সহ‌যোদ্ধা শহীদ হন। সেদিন ২ লক্ষ মা বোন ইজ্জত  দিয়েছিল। এই দেশটাকে  স্বাধীন করতে অনেক জীবন দিতে হয়েছে। স্বাধীন দেশটা যেন শেখ হাসিনা সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারে সেজন্য আপনারা সকলে দোয়া করবেন।
স্মৃতিচারন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্মৃতি সংরক্ষণ  ৭১ এর সদস্য সচিব সাংবাদিক অভিজিৎ রায়।
ফম/এমএমএ/

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম