চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির ভিতরে বাহিরে

(উপরে ফকফকা আর ভেতরে কানাবগা)

॥ মইনুদ্দিন লিটন ভূঁইয়া ॥ কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লা’র ‘আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছ তৃমি হৃদয় জুড়ে’ লেখা গানটি পৃথিবীর রাংলা ভাষাভাষি মানুষের অন্তরে স্থান করে নিয়েছে। এটি অবশ্য তিনি কবিতা লিখেছিলেন। পরে এতে সুর দিয়ে গানটি তৈরী হয়। এমন গানের কথা দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করলাম। কারণ গানটি মধুর। সুরটিও মধুর। আমাদের অন্তরের ভিতরে বাহিরে কতো মধুর স্বপ্ন আর না বলা কথা রয়ে যায়। কতো অতৃপ্তি থেকে যায়। তারপরেও যারা এই জেলা শহরে শিল্প চর্চা করছে তাদের হ্ৃদয় জুড়েও একটি ভাবনাই সবসময় বিরাজ করে। আর সেটা হলো জেলা শিল্পকলা একাডেমি। এটাই স্বাভাবিক।

ছোট শহরগুলোতে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা আর বিকাশ বলি সবটাই শিল্পকলা একাডেমিকে কেন্দ্র করে বেড়ে উঠে। স্থানীয়ভাবে শিল্প-সংস্কৃতির পরিচালনাটা জেলা শিল্পকলা একাডেমির নেতৃত্বের উপরেই অনেকটা নির্ভর করে। কারন এখানে এখনো অন্য বিকল্প সেভাবে গড়ে উঠেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন আছে,পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র আছে। তারা তাদের সাধ্যমতো কাজটা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপকভাবে জেলার শিল্পসংস্কৃতি প্রসারের জন্য শিল্পকলা একাডেমির বিকল্প তো এখনো তৈরী হয়নি। আগে টাউন হলটা ছিল। সেটা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে শিল্পীরা আন্দোলন করলে একটি পৌর অডিটরিয়াম নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিছুটা কাজও হয়। কিন্তু বেশ কয়েক কোটি টাকা খরচের পরে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। এখন অনেকটা পরিত্যাক্ত ভবনের মত মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। ফলে জেলা শিল্পকলা একাডেমিই শিল্পী ও সংগঠনগুলোর সবেধন নীলমনি। কিন্তু নীলকান্তমনির মতো শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনাও দুস্প্রাপ্য হয়ে আছে। বঞ্চিত হচ্ছে জেলার শিল্পী ও সংস্কৃতির সম্ভাবনাময় সংগঠনগুলো। কিছু অনিয়ম,কিছু বৈষম্য,কিছু সেচ্ছাচারিতা আর দূর্ণীতির কবলে নিমজ্জিত জেলা শিল্পকলা একাডেমি। এর থেকে উদ্ধারের কি পথ তা আমি জানি না। তবে যেসব অনিয়ম আর দুর্নীতি চলছে তার কিছু খতিয়ান আমাদের হাতে এসেছে। মনে হয় যদি এসব বন্ধ করা ও দূর করা যায় তাহলে অনেকটা শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিবেশ তৈরী হবে। সবাই মিলে কাজ করে চাঁদপুরের শিল্প-সংস্কৃতিকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়া যাবে। এই জেলা শিল্পকলা একাডেমির ভিতরে যেভাবে দুর্নীতি চলছে তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। সেটা জানলে সবারই পিলে চমকে যাবে।

অতি সম্প্রতি ২৩ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে শিল্পকলা মঞ্চে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে এক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে দেখা যায়, চাঁদপুরে জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে বিশ^ সঙ্গীত দিবস ও বর্ষা মঙ্গল উপলক্ষে শিল্প আড্ডার নামে একটি অনুষ্ঠানে একাডেমির এডহক কমিটির জনৈক সদস্য কেবল মাত্র একটি ব্যানার বানিয়ে মঞ্চে টানিয়ে দরজা বন্ধ রেখে সামনে কিছু শিল্পী দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে পত্রিকায় ছাপিয়ে উক্ত অনুষ্ঠানের নামে প্রচার করেন। এভাবে পুরো টাকাটাই হাপিস্ করে দেয়া হয়। একই প্রক্রিয়ায় আরো অনেক অনেক অনুষ্ঠানের নামে কোন অনুষ্ঠান না করেই বরাদ্দের টাকা হাতিয়ে নেয়ার প্রমান রয়েছে।

গত করোনাকালে বাংলাদেশ গ্রুপ ধিয়েটার ফেডারেশনের এক নেতা চাঁদপুরের নাট্য দলগুলোর জন্য কিছু টাকা অনুদান পাঠিয়ে ছিলেন। টাকাটা শিল্পকলা একাডেমির এডক কমিটির সদস্য যিনি চাঁদপুর থিয়েটার ফোরামের নেতা, তার কাছে পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য নাট্যদলগুলো সেই টাকা পায়নি। ওটাও হাপিস্। এর পূর্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিল্পীদের জন্য করোনকালীন প্রনোদনা ও অনুদান পাঠালে তা নিয়েও ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। এরও অনেক প্রমান রয়েছে। এছাড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

একাডেমির হল ভাড়া, প্রশিক্ষন ক্লাশের আয়-ব্যয়ের হিসাবটাও যেভাবে খাতা পত্রে দেখানো হয় তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। শিল্পকলার প্রশিক্ষন বিভাগগুলোর প্রায় ৬০ ভাগ ছাত্রছাত্রী চিত্রকলার। গানে ২৫ ভাগ,নাচে ১০ ভাগ, আবৃত্তিতে ৩ ভাগ,তবলে ২ ভাগ ছাত্রছাত্রী রয়েছে। অভিনয়ে বিভাগটি বন্ধ। প্রশিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট বৈষম্য ও অনিয়ম রয়েছে। বাদ্য যন্ত্র বলতে ৪টি হারমোনিয়ামের মধ্যে মাত্র ১টি সচল,বাকি ৩টি নষ্ট। ২ জোড়া তবলের মধ্যে ১ জোড়াই নষ্ট। পাশাপাশি অডিটরিয়ামের মেনটেইনেন্স তো আছেই। বর্তমানে এখানে অনুষ্ঠান করতে লাইট ও সাউন্ড বাইরে থেকে ভাড়া করতে হয়। একাডেমির প্রায় সব লাইট ও সাউন্ড সিস্টেমের যন্দ্রগুলো বিকল। মোট ৩০টি হেলোজেন এর মধ্যে ১১টির আলো জ্বলে। বিশেষ লাইট প্রয়োজন ২০টি। আছে ৩টি। এর মধ্যে ২টিই জ্বলে না। লাইটের ডিমার নষ্ট,কন্ট্রোল মিক্সচার ডিএমএক্স নষ্ট। ২জোড়া স্পিকার আছে। সাউন্ড মনিটর আছে ২টি, কিন্তু ২টাই নষ্ট। লাইট ও সাউন্ডের তার ও জেকগুলো নষ্ট। ভোকাল মাইক্রোফোন প্রয়োজন ১৫টি,আছে ৭টি। এর মধ্যে ২টি নষ্ট। নাটকের জন্য বিশেষ মাইক্রোফোন প্রয়োজন ৮ থেকে ১০টি। আছে ৩টি। এর মধ্যে ১টি নষ্ট। তিন তলার মহড়া কক্ষের সিলিং নষ্ট,পানি পড়ে। হলের ভিতরেও পানি পড়ে। ১০টি এসির মধ্যে ৫টিই নষ্ট। মঞ্চেরে উইংগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে। পেছনের পর্দাও বদলাতে হবে। মাত্র ২৬০টি চেয়ার,আর কিছু সোফা নিয়ে উপরে ফকফকা আর ভেতরে কানাবগা দুরাবস্থায় জর্জরিত চাঁদপুরের জেলা শিল্পকলা একাডেমি।

বিপদ হচ্ছে এসব লিখলে আবার তাদেরই পোয়াবারো। এসব কারণ দেখিয়ে তারাই জেলাপ্রসাশকের কাছে বাজেট দেন। তারপর সেটা পাস করিয়ে নিজেরাই অতি নিম্নমানের উপকরণ কিনে আনেন। ছ’মাস এক বছর পরে সেগুলো আবার বিকল হয়। এভাবেই আবার বাজেট,আবার টাকা,আবার বিকল-আবার লোপাট। এই পক্রিয়াই চলছে দীর্ঘকাল। কোন অনুষ্ঠান এলে এককভাবে সবকিছু কুক্ষিগত করে বাজেটের টাকার বাইরে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে অনুষ্ঠানের নামে টাকা তোলা হয়। কোন হিসাব দেয়া হয় না। কোনভাবে বাজেটের বরাদ্দ টাকার সাজানো হিসাব দেখানো হয়।

নিজের প্রভাব,জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রকট ইগো নিয়ে কেবল নিজেদের জাহির করতেই ব্যস্ত শিল্পকলা একাডেমির এডহক কমিটির কোন কোন সদস্য। তাই এমন মানসিকতার ব্যাক্তিদের হাতের ছোবল থেকে এই প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত না করলে এসব দূর্ণীতি চলতেই থাকবে। আমি চাইলে সব প্রমানসহ উল্লেখ করতে পারতাম। কিন্তু প্রশংসা করা যতটা সুখের,নিন্দা করা ততোটাই দুঃখের,সবার জন্যও বিব্রতকর। তাছাড়া জেলা প্রশাসক মহোদয় পদাধিকার বলে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। তিনি জানুক কিংবা না জানুক এর সব দায় তাঁর উপরেই বর্তায়। তাই বলছি, মহোদয় আর ঘুমিয়ে না থেকে এবার আঁড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠুন প্লিজ!

 

ফোকাস মোহনা.কম