চাঁদপুরে চিহ্নিত যক্ষারোগী এগারো শতাধিক

নেই পূর্ণাংগ যক্ষা হাসপাতাল, সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারন জনগণ

চাঁদপুর : জেলায় যক্ষা প্রতিরোধে মটিভেশনাল বা সচেতনতামূলক কর্মসূচী কম করায়, অপর্যাপ্ত প্রচার প্রচারনা , জেলা সদরে পুর্নাংগ যক্ষা হাসপাতাল নাই বিধায় জেলায় যক্ষারোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে । যক্ষা রোগীরাও সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না। এ জেলা শহরে চাঁদপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা শরিয়তপুর ও লক্ষীপুরের রায়পুরের রোগীরাও চিকিৎসা নিতে আসে ।

এ জেলায় বতর্মানে চিহ্নিত যক্ষারোগীর সংখ্যা ১১১১ জন ।এর মধ্যে ৫০৬ জনই নারী ও শিশু রোগী ।বাকিরা পুরুষ ও ছেলে শিশু রোগী। তাছাড়া, জেলায় ১২ জন মারাত্মক যক্ষারোগী রয়েছে ।

এ সব তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা সিভিল সার্জন অফিসের যক্ষা বিষয়ক সারভিল্যান্স মেডিকেল অফিসার ডা: ইয়াছিন আল আমিন এবং ব্রাক জেলা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো: গোলাম মোস্তফা । তারা যৌথভাবে যক্ষার চিকিৎসা কার্যক্রম দেখছেন।
একান্ত আলাপে ডা ইয়াছিন ইউএনবিকে জানান, দেশে যক্ষাপ্রবণ জেলার মধ্যে চাঁদপুরও একটি ।

তিনি অবশ্য জানান, তাঁর সাথে যক্ষা রোগীদের সরাসরি কোন যোগাযোগ নেই । জেলার ৮ উপজেলায় যক্ষার জন্য আলাদা কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও নেই।

চাঁদপুর জেলা শহরের স্টেডিয়াম রোডে ১৯৬৮ সালে স্থাপিত একটি বক্ষব্যধি (যক্ষা) ক্লিনিক রয়েছে । ( যার ২তলা ভবনের এখানে সেখানে ফাটল বা ভেংগে পরছে ।) এখানে প্রতিদিন এ জেলার উপজেলা ও পার্শ্ববর্তি শরিয়তপুর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল/ দূর দুরান্ত থেকে আগত নারী পুরুষ ও শিশুদের আউটডোর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বিনা মুল্যে ।

মাঝে মাঝে রোগীদেরকে জেলা শহরের ভুইয়াবাড়ি রোডে অবস্থিত ব্রাক জেলা অফিসেও এক্সরে করতে যেতে হয় । এমনটাই জানান মতলব দক্ষিনের উপাধি ইউনিয়নের সন্দেহজনক যক্ষা রোগী নুরজাহান বেগম (৪৫) । তিনি ইউএনবি কে বলেন এক্সরে করার জন্য তিনি ৩০০ টাকা দিয়েছেন। যোগাযোগ করলে জেলা ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা এ খবরের সত্যতা স্বীকার করতে নারাজ । তিনি বলেন তার অফিসে এক্সরে করা হয় বিনা মুল্যে । নুরজাহান জানান, তাকে ২/৩ দিন আসতে হচ্ছে।

ব্রাক ম্যানেজার গোলাম মোস্তফা জানান, চাঁদপুর সদরে যক্ষা রোগীর সংখ্যা ১৬৯, এর মধ্যে পুরুষ ও ছেলে শিশু ৮৯ জন এবং ৮০ মহিলা ও মেয়ে শিশু।

তাছাড়া, ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২ জন। এর মধ্যে সাতজনই মহিলা। সদরের লক্ষীপুরে মারাত্মক যক্ষা (MDR) রোগী ২ জন। (১জন মহিলা ফজিলাতুননেছা ,৪০,ও ১ জন পুরুষ, ফারুক হোসেন, ৪৩,) কচুয়া উপজেলায় ১৯০ জন । এর মধ্যে নারী ও শিশু ৭৬ জন। এখানে ২ জন মারাত্মক (mdr) যক্ষা রোগী আছে । হাজিগঞ্জে ১৬০ জন। ৮০জন নারী ও শিশু, বাকিরা পুরুষ ও ছেলে শিশু। মতলব উত্তরে ১২৬ জন, এর মধ্যে নারী ও মেয়ে ‍শিশু ৪৯ । বাকি ৭৭ জন পুরুষ ও ছেলে শিশু। শাহরাস্তিতে ১২২ জন, । এর মধ্যে নারী ও মেয়ে শিশু ৬৩ জন।বাকি ৫৯ জন ছেলে ও পুরুষ। তাছাড়া, মারাত্মক যক্ষায় আক্রান্ত ২ জন।

মতলব দক্ষিনে ১১০ জন। এর মধ্যে নারী ও মেয়ে শিশু ৫৩ জন। । এখানে মারাত্মক (MDR) যক্ষা রোগী ৩ জন। এ উপজেলার নওগাঁও গ্রামের যক্ষারোগী- সেলিনা বেগম (৩৩) , ঢাকিরগাঁও এর খোরশেদ আলম (৪৭) ও দিঘলদী গ্রামের মুজিবুল হক (৫০) জানান, ব্রাকের স্টাফরা বাড়ি এসে ওদেরে ওষুধ খেতে সহযোগিতা করে।

ফরিদগঞ্জে রোগীর সংখ্যা ১৫৫ জন। এর মধ্যে নারী ও মেয়ে শিশুর সংখ্যা ৭৪ জন। বাকিরা পুরুষ ও ছেলে শিশু । তাছাড়া এখানে মারাত্মক (MDR) যক্ষারোগী দুজন। হাইমচরে রোগীর সংখ্যা ৬১ জন। এর মধ্যে নারী ও মেয়ে শিশুর সংখ্যা ৩১ জন ।বাকি ৩০ জন পুরুষ ও ছেলে শিশু । এখানে একজন মারাত্মক যক্ষা রোগী রয়েছে ।

ব্রাক জেলা ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা জানান, এ বছর এ পর্যন্ত ৪ টি মটিভেশনাল সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ।

জেলায় ৮ উপজেলার ৮৯ ইউনিয়নে ব্রাকের ৭৩৬ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছে, যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যক্ষা রোগীদের ওষুধ সেবন করান। আছে ১৬ জন্য কমিউনিটি স্বাস্থ সহকারি ও ৪৬ জন মাঠ কর্মী ।

তিনি আরো জানান, সকল মারাত্মক যক্ষা (MDR) রোগীকে ব্রাক সংস্থা কর্তৃক নিযুক্ত মাঠকর্মী/স্টাফগন ওষুধ ও পাশাপাশি ফলফলাদি খাওয়ার জন্য প্রতি মাসে নগদ অর্থ (এক হাজার টাকা করে) সহায়তা প্রদান করা হয় ।

গতবার (২০২১)করোনার সময় জেলায় যক্ষা রোগী ছিলো ৪৮৪৯ জন। ২০২০ এ যক্ষারোগী ছিলো ৩হাজার ৪০০ এর বেশী । বতর্মানে ১১১১ জন। তা হলে বাকি রোগীরা কোথায় ? এ প্রশ্নের কোন জবাব পাওয়া যায় নি।

চাঁদপুর বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায় সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাক্তার মো: হাসান মুখে মাস্ক পড়ে টাচ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত ।তিনি কোন কথা বলতে চান নি বা তথ্য জানান নি। বললেন, দোতালায় জুনিয়র কনসালটেন্টের কাছে যান।

জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা মাহমুদল্লাহ সায়েদ জানান, তিনি প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৭০ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে ৫-৭ জন শিশু, ৩০-৩৫ জন মহিলা রোগী আসে, যারা জ্বর, (লাকড়ির চুলায় রান্নার সময় সৃষ্ট ধোয়ার কারনে) কাশি ও শ্বাসকষ্ট এবং আরো অন্যান্য রোগে ভুগছে ।

তিনি আরো জানান, শহরের শিশু বিশেষঞ্জ ডাক্তাররা শিশু রোগীদের এখানে রেফার করেন।

উপজেলা পর্যায়ে যক্ষার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নাই বিধায় টাকা পয়সা জোগাড় করে / ব্যবস্থা করে প্রতিদিন প্রত্যন্ত অঞ্চলের দূর দূরান্ত থেকে সন্দেহজনক যক্ষা রোগীকে আসতে হয় জেলা শহরে । তার সাথে অন্য একজনকেও নিয়ে। এদের অপেক্ষা করা বা বসার কোন ব্যবস্থা নাই এ বক্ষব্যধি ক্লিনিকে। বাড়ি থেকে একজন রোগীকে পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য এখানে কমপক্ষে ২/৩ দিন আসতে হয় এ ক্লিনিকে। মতলব দক্ষিন উপজেলার উপাধি এলাকা থেকে আসা রোগী নুর জাহান বেগম ও তার সাথে আসা তার ছেলেরা এ কথা জানান। একই কথা অন্যরাও জানান।

তাই জেলার উপজেলার স্বাস্থ কমপ্লেক্সগুলোতে যক্ষারোগের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করলে উত্তম হতো বলে জানান ভুক্তভোগী কযজন রোগী ও সাথে আসা তাঁদের স্বজনরা।

তাছাড়া, শহর বা হাট বাজারের ব্যস্ততম স্থানে সচেতনমুলক বিল বোর্ড, মোবাইলে যক্ষা সংক্রান্ত মেসেজ দিলে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভালো হয়। স্কুল ও মাদ্রাসার টেক্সট বইয়ে যক্ষা রোগ সংক্রান্ত ছোটগল্প অন্তর্ভুক্ত করলে ছোট বেলা থেকেই মানুষের মাঝে যক্ষারোগ সম্পর্কে আরো সচেতনতা সৃষ্টি হবে বলে অনেক সিনিয়র সিটিজেন ও প্রবীণ শিক্ষকগন মতামত ব্যক্ত করেন।
ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম