রফিকুজ্জামান রণি।। চর্যাপদ একাডেমির বই উপহার কর্মসূচির প্রধান উদ্যোক্তা যেহেতু আমি, সঙ্গত কারণেই প্রশ্নের সম্মুখিন আমাকেই হতে হয় বারবারÑ কেন এই কর্মসূচি? উদ্দেশ্য কী? এতে সমাজ কতটুকু পেয়েছে? ইত্যাদি ইত্যাদি।
ফেসবুক ও পাঠ্যসূচির গণ্ডিতে আর নই, চর্যাপদের সঙ্গে থেকে পড়ব সকল বইÑ আমাদের কর্মসূচির শ্লোগানের দিকে তাকালেই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়। নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না।
সাধারণত গ্রাম অঞ্চলে ভালো কোনো বইয়ের দোকান পাওয়া যায় না, কাছে-ধারে পাওয়া যায় না পাঠাগার; পত্রিকা বোঝাই সাইকেল নিয়ে ছোটাছুটি করে না হকার। সেখানকার মানুষ পাঠ্যপুস্তকের বাইরের জগতের সঙ্গে সহজে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে না। শহর থেকে বই আনিয়ে পড়ার সামর্থ্যও থাকে না সবার।
অনলাইননির্ভর বইয়ের বাজার গ্রামের জন্যে ভাল কিছু বয়ে আনতে পারেনি এখনও। ডাক-কুরিয়ারের ঝামেলা তো লেগেই থাকে। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে না। প্রযুক্তিনির্ভর সাহিত্য কখনও বইপাঠের আনন্দ দিতে পারে না। বইয়ের ঘ্রাণের মতো শুদ্ধতম ঘ্রাণ অন্য কোথাও নেই। তাই কাঁধে বই নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে যায় চর্যাপদ একাডেমির টিম। পাঠ্যসূচির বাইরের জগতের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক তৈরির প্রয়াস চালানো হয়। এ কর্মসূচি শহরেও পালন করা হয়। সুখ-দুঃখের হাজারও স্মৃতি বুকে নিয়ে কাজগুলো করতে হয়, অবলম্বন করতে হয় নানা রকম কৌশল।
শব্দ কৌশল
সাধারণত ‘বিতরণ’ শব্দটি এতটাই সাদামাটা যে এখানে বিশেষত্ব বলে কিছু থাকে না। এ শব্দটি ব্যবহার করলে বিষয়টা তেমন গুরুত্ব পাবে না। সেই চিন্তাধারা থেকে ‘উপহার’ শব্দটি ব্যবহার করা হলো। উপহার প্রাপ্ত জিনিসের প্রতি মানুষের আলাদা দৃষ্টি থাকে। শ্রদ্ধাভক্তি থাকে। আমাদের বিশ^াস, উপহার হিসেবে কেউ বই পেলে সম্মান রক্ষার্থে হলেও সেটা পড়ার চেষ্টা করবে। মূলত বইয়ের দিকে মানুষকে টেনে আনতে কৌশল করে নাম দেয়া হয়Ñ চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমির বই উপহার কর্মসূচি।
সময় ও পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে শ্লোগান তৈরি
উপহার কর্মসূচি মানুষের মনে ঢুকিয়ে দিতে অন্ত্যমিলসম্পন্ন কিছু শ্লোগান তৈরি করা হয়। যেমন: ‘বই কখনও হয় না পর, বইয়ের সঙ্গে বাঁধব ঘর’; ‘ছড়িয়ে দিতে বই, পথের মানুষ হই’; ‘বইয়ের দিকে বাড়াও হাত, ঘুচে যাবে অন্ধ-রাত’; ‘ফেসবুক ও পাঠ্যসূচির গণ্ডিতে আর নই, চর্যাপদের সঙ্গে থেকে পড়ব সকল বই’; বই হোক জঙ্গি রোধের শক্তি, বইয়ের প্রতি বাড়ুক জাতির ভক্তি’; ‘পড়ি বই, বড় হই’ ইত্যাদি। ব্যানার-ফেস্টুনে এগুলো ব্যবহার করা হয়। এতে লোকদৃষ্টি বাড়ে। এসব করার পেছনে একটাই কারণ, লোকের ভেতরে বই শব্দটা গেঁথে দেয়া। আলোকিত মানুষ হতে হলে পৃথিবীকে জানতে হয়। পৃথিবীকে জানতে হলে বইয়ের কাছে আশ্রয় নিতে হয়।
বই সংগ্রহের কৗশল ও স্যোশাল মিডিয়ার বিশুদ্ধ ব্যবহার
প্রথমে আমার নিজের বুকসেলফের বই দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। সিদ্ধান্ত ছিল প্রত্যেক মাসে কমপক্ষে ১০০টি বই উপহার দেওয়া হবে। স্কুল-কলেজে অনুষ্ঠান করে বই দিতে গিয়ে সংখ্যাটা বাড়াতেই হলো। তখন প্রায় সাত-আট‘শ বই-ম্যাগাজিন ছিল আমার সংগ্রহশালায়। ভাবলাম, দরকার পড়লে সবগুলো বইই কর্মসূচিতে দিয়ে দেব। তারপরও থেমে থাকব না। কিন্তু নিজের বই দিয়ে যে এই কর্মসূচি খুব বেশিদিন চালানো যাবে না, এটাও উপলব্ধি করলাম। বাধ্য হয়ে স্যোশাল মিডিয়ার সহযোগিতা নিলাম।
একদিন নিজের ফেসবুক ওয়ালে বিস্তারি লিখে স্ট্যাটাস দিলাম। চর্যাপদ পরিবারের সদস্যরা সেটা কপি পোস্ট করল। একের পর এক উপহার কর্মসূচির ছবিও পোস্ট করতে লাগলাম। পত্রিকায় সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হতে লাগল। রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেল। বই আসতে লাগল সারাদেশ থেকে। কেউ এক কপি, কেউ দশ কপি, কেউ পঞ্চাশ কপি, কেউ বা একশ কপিÑএভাবেই আসতে লাগল একের পর এক বই। আমরাও প্রাণ খুলে দিতে লাগলাম উপহার।
যারা বই স্পন্সর করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাদের ছবিসহ আমাদের ফেসবুক একাউন্টে পোস্ট করা হতো। এতে অন্যেরাও স্পন্সর করতে উৎসাহ পেতেন। সারাদেশের লেখক, প্রকাশক ও লিটলম্যাগ সম্পাদকরা আমাদের পাশে দাঁড়ালেন। চর্যাপদের ডাকে সাড়া দিয়ে কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করলেন। অনেকে সহযোগিতা করতে না পারলেও দূরে থেকে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতেন। নিজের আইডিতে পোস্ট করে প্রচারণা চালাতেন। উৎসাহ-উদ্দীপনা দিতেন। স্যোশাল মিডিয়ার বিশুদ্ধ ব্যবহারের ফলে এ কর্মসূচি অল্পদিনেই জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক কর্মসূচি পালন
অনেকেই প্রশ্ন করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক কেন বই উপহার কর্মসূচি পালন করা হয়। অন্যভাবে হয় না কেন? তাদের জ্ঞাতার্থে বলি, আসলে চর্যাপদ একাডেমি শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিকই বই উপহার প্রদান করে, এমন কিন্তু নয়। পথে-প্রান্তরে অথবা যানবাহনে যেখানেই শিক্ষিত মানুষের দেখা মেলে সেখানেই বই উপহার প্রদান করা হয়। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানেও উপহার দেয়া হয় বই। রাষ্ট্রের বিশিষ্টজন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিকর্মীকেও চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি বই উপহার প্রদান করে। শুধু তাই নয়, আমাদের প্রত্যেকটি সাধারণ অনুষ্ঠানেও থাকে বই উপহার কর্মসূচি। অতিথিবৃন্দ সহ উপস্থিত সকলকে আমরা বই ও ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়ার চেষ্টা করি।
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বই উপহার কর্মসূচি বেশি পালন করা হয়, এটা সত্য। যৌক্তিক কারণও আছে। গ্রামেগঞ্জে ঢুকে হুট করে কারো হাতে বই তুলে দেয়া নিরাপদ নয়। বিশেষ করে কোনো তরুণীর হাতে বই তুলে দিলে বড় ধরনের বিপত্তি ঘটতে পারে। সেইসঙ্গে ছেলেধরার অপবাদও ঘাড়ে এসে পড়তে পারে। হাজার রকম জেরা-কৈফিয়তের ঝক্কি-ঝামেলা তো আছেই। এতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হবে। গতি হারাবে কাজ।
ভেবে দেখলাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সেখানে বই উপহার দেয়া হলে এবং অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে সচেতনতামূলক বক্তব্য পেশ করা হলে, কর্মসূচিটা বেশি গতিশীল হবে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক কর্মসূচি পালনে বেশি জোর দিচ্ছি আমরা। আজকের শিক্ষার্থীরা এক সময় নেতৃত্ব দেবে পৃথিবী। সুতরাং বই পড়ার দিকে তাদের আগ্রহ জাগানো সময়ের দাবি। এ কাজে সম্মানিত শিক্ষকরা যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তা ভোলার মতো নয়। সকল কর্মসূচিতেই শিক্ষক ও কমিটির লোকদের সহযোগিতায় মুগ্ধ হয়েছি।

ভিন্নতা আনার চেষ্টা
বই উপহার কর্মসূচি গ্রহণযোগ্য ও নান্দনিক করে তুলতে মাঝেমধ্যে আবৃত্তি, কৌতুক, গান ও নৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা বিনোদন পায়। শুধু তাই নয়, তাদের উৎসাহ দিতে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং ৫/৬ জন শিক্ষার্থীকে প্রদান করা হয় পুরস্কার। বন্ধের দিনে ঘুরতে গেলেও আমরা বই উপহার দিয়ে আসি। ঘোরাঘুরিও হয়, কর্মসূচিও পালন হয়। এতে বইয়ের মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে নানা প্রান্তে।
ব্যক্তি রুচির প্রাধান্য
বই উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি রুচির দিকটা প্রাধান্য দেয়া হয়। নাট্যকারদের নাটকের বই, সংগীতাঙ্গনের ব্যক্তিদের গানের বই, কবিদের কবিতার বই, কথাসাহিত্যিকদের গল্প-উপন্যাস, প্রাবন্ধিকদের প্রবন্ধের বই, শিশুকিশোরদের শিশুতোষ বই ও শিক্ষামূলক ম্যাগাজিন উপহার প্রদান করা হয়। রুচির সঙ্গে খাপ খাওয়ায় অনেকেই বইটা না পড়ে থাকতে পারে না।
বই উপহার মাস ঘোষণা
করোনার কারণে, ব্যাপক হারে কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সেটা পুষিয়ে নিতে সেপ্টেম্বর মাসকে চর্যাপদ একাডেমির বই উপহার মাস ঘোষণা করা হয়। পথেঘাটে, অফিস আদালতে ও যানবাহনে চলে বই উপহার কর্মসূচি। ধনি-গরিব, ছোট-বড় সবাইকে উপহার দেয়া হয় বই। প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের হাতেও তুলে দেয়া হয় বই। কাজটা ব্যাপক সাড়া পেয়েছে, তাই প্রতি বছর সেপ্টেম্বরকে চর্যাপদ একাডেমির বই উপহার মাস হিসেবে গণ্য করার কথা আমরা ভাবছি।
বই উপহার মেলা
আমরা সাধারণত ‘বইমেলা’ শব্দের সঙ্গে সবাই পরিচিত। কিন্তু ‘বই উপহার মেলা’ কথাটার সঙ্গে কেউ পরিচিত নই। চর্যাপদ একাডেমি সর্বপ্রথম এই শুরু করেছে এমন আয়োজন। গত ডিসেম্বর মাসে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর আনন্দে চাঁদপুরের পর্যটন এলাকা বড় স্টিশন মোলহেডে এই মেলার আয়োজন করা হয়। গান, আবৃত্তি, কৌতুক ও বক্তৃতার মধ্য দিয়ে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানটি। জাতীয় সংগীতের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। দেখেছি, মানুষ দল বেঁধে বই উপহার গ্রহণ করতে ছুটে আসছে। জনস্রোতের কারণে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, কিছুকালের জন্যে উপহার কর্মসূচি স্থগিত রাখতে বাধ্য হতে হয়েছে। ছোট বড়, নারীপুরুষ সবার মুখে মুখেÑ‘আমাকে একটি বই দিন।’ এই আয়োজন আমাকে মুগ্ধ করেছে। বেঁচে থাকলে এবং সম্ভব হলে প্রতি বছর বই উপহার মেলার আয়োজন করার চেষ্টা করব আমরা।
অতীত থেকে প্রেরণা
ছোটবেলায় দেখেছি, গ্রামের মানুষ এক টুকরো কাগজ পেলে বসে বসে পড়ে। ছেঁড়া-ফাড়া বইয়ের পাতা সামনে পেলে মনোযোগ দিয়ে পড়ে। শীতকালে রোদে বসে চুল ছেড়ে দিয়ে বই পড়তে অনেক তরুণীকে দেখেছি। বাজার থেকে কিনে আনা নতুন লুঙ্গির ভেতর থেকে পত্রিকা খুলেও পড়তে দেখেছি। বাদাম খেয়ে টুকরো কাগজটাও ফেলে দেয়ার আগে একটু পড়ে নিতে দেখেছি। দৃশ্যগুলো খুব ভাল লাগত।
তখন স্কুল-কলেজের সামনে কিছু স্টিশনীর দোকানপাট থাকত। সেখানে ঈদ-কার্ড, ভিউকার্ড ও দুর্বল মানের রোমান্টিক উপন্যাস পাওয়া যেত। খুব বেশি ভাল বই পাওয়া না গেলেও তরুণ-তরুণীরা প্রথম প্রেমের সাক্ষী হিসেবে এসব বই উপহার দিত। সে বই যুগের পর যুগ যত্ন করে রাখত। সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেলেও উপহারটুকু সযত্নে রেখে দিত। বইগুলোর তেমন মান ছিল না, সস্তা প্রেমকাহিনী হলেও প্রচুর চাহিদা ছিল তখন। কারণ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভালো মানের বই পাওয়া যেত না, সেগুলোই ছিল একমাত্র সম্বল।
শহর থেকে গ্রামে ফেরার সময় আমি ব্যাগভর্তি বই নিয়ে যেতাম। পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখাগুলোও সঙ্গে নিয়ে যেতাম। বাড়িতে সেগুলো অনেকেই পড়তে চাইত। দিতাম। দেখতাম খুব মনোযোগ সহকারে পড়ে শেষ করে ফেলতো তারা। পত্রিকায় আমার লেখা দেখলে আরও আগ্রহ নিয়ে পড়ত। চর্যাপদ একাডেমির দায়িত্ব গ্রহণের পর একের পর এক সেই দৃশ্য চোখে ভাসতে লাগল। মনে হলো, গ্রামের মানুষ তো পড়তে চায় কিন্তু চাহিদা মতো হাতে পায় না বই। আমরা যদি তাদের কাছে বই নিয়ে যাই, তাহলে কেমন হয়? মন থেকে সায় পেলাম। সবার মতামত নিয়ে থিমটা কাজে লাগাতে নেমে পড়লাম। সেই যে শুরু, এখনও চলছে। আশা করি, আগামীতেও চলবে। তবে এই কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে স্বর্গীয় পলান সরকার ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে আমরা প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছি।
গ্রামে গ্রামে যাওয়ার কৌশল
দলবেঁধে গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে বই উপহার দেওয়া সহজ কাজ নয়। গাড়িভাড়া, ব্যানার-ফেস্টুন, ফুল-ফিতা, চা-বিস্কুট, প্রতিযোগিতার জন্যে উপহার সামগ্রী বাবদ অনুষ্ঠান প্রতি ১৫০০/- থেকে ২০০০/-টাকা খরচ পড়ে যায়। এছাড়া দূরদূরান্ত থেকে কেউ বেশি পরিমাণে বই পাঠালে সেগুলো তুলতে কুরিয়ার চার্জ ও পরিবহন খরচ লাগে। যে এলাকায় বই উপহার দেয়া হয় সেখানে ব্যানার-ফেস্টুন টানিয়ে আসতে হয়, যাতে বিষয়টা সে অঞ্চলের লোকজনের মন থেকে হুট করে উধাও না হয়ে যায়। শহরের প্রধান প্রধান স্পটেও সাঁটানো হয় ব্যানার-ফেস্টুন। যার ফলে প্রতিমাসে বই উপহার কর্মসূচিতে মোটা অংকের টাকার দরকার পড়ে। যা বহন করতে আমরা বেগ পোহাতে হয়।
চর্যাপদ একাডেমি পরিবারের প্রায় সকলেই তরুণ। এখানে কোনো উপদেষ্টা নেই। আর্থিক সহযোগিতা নিয়েও কেউ এগিয়ে আসে না। তাই কৌশল করে কর্মসূচি চালাতে হয়। প্রতি কর্মসূচিতে ছোট্ট একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক, সদস্য সচিব এবং সন্বয়ক মিলিয়ে ৪-৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রতি অনুষ্ঠানের জন্যে যে টিম দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাদের নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যাই।
যেই অনুষ্ঠানে যারা নেতৃত্বে থাকে সেই অনুষ্ঠানের খরচ তারাই জোগাড় করে। তুলনামূলকভাবে খরচ বেশি পড়লে আমরা সবাই মিলে মিটিয়ে নিই। তবে প্রত্যেক অনুষ্ঠানে আমার পকেটে হাত দিতেই হয়। তারপরও কর্মসূচিগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এই কৌশলটুকু না করলে কাজ করা বড় কঠিন হয়ে পড়ত।
আমাদের উদ্দেশ্য
মাদক, জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বইপাঠের মাধ্যমে প্রজন্মকে সচেতন করে তোলা এবং ফেসবুক-ইউটিউবের শুদ্ধ ও সীমিত ব্যবহারের প্রতি আহ্বান জানানো।
মিডিয়া সার্পোট
স্বীকার করতেই হয়, বই উপহার কর্মসূচিতে অভাবনীয় মিডিয়া সাপোর্ট পেয়েছি। বিশেষত চাঁদপুরের স্থানীয় পত্রিকাগুলোর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। দেশের অনলাইন মিডিয়াগুলোও সবর্দা আমাদের পাশে ছিল। সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি অনেকে বুদ্ধিপরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। জাতীয় পত্রিকাগুলোও এগিয়ে এসেছে। মিডিয়ার সাপোর্ট এ কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে প্রচার-প্রচারণা হয়েছে। চর্যাপদ একাডেমির প্রতিটি সদস্য আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। কর্মসূচি সফল করতে দিনরাত পরিশ্রম করেছে তারা।
নান্দনিক কষ্ট
বই উপহার কর্মসূচি আমাকে কিছু নান্দনিক কষ্ট দিয়েছে। তা হল, আমার কাঁধব্যাগ নিয়ে হাঁটাচলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। আমি সাধারণত কাঁধব্যাগে নিজের ব্যক্তিগত বই রাখতাম। সুযোগ পেলে পছন্দসই বই ব্যাগ থেকে বের করে পড়ে নিতাম। বই উপহার কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর মানুষ আমাকে দেখলেই বই উপহার চাইতে শুরু করে। কখনও কখনও কাঁধব্যাগ টেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় বই বের করে নিয়ে যায়। যতই বোঝানোর চেষ্টা করি, কে শোনে কার কথা।
এই যে জোর করে বই উপহার আদায় করে নেয়া, আমার পছন্দের বইগুলো খোয়া যাওয়া; এতে আমি বিব্রত হতাম। কষ্টও পেতাম। পরক্ষণেই আনন্দে দুলে উঠত মন। মানুষ তো জেনেছে আমরা বই উপহার দিই! পড়ার জন্যেই তো জোর করে বই আদায় করে নিচ্ছে তারা, এ যে ভীষণ আনন্দের কথা। নিজের কিছুটা খোয়া গেলেও এই চমৎকার অভিজ্ঞতাটুকু প্রাপ্তির খাতাতেই লিখে রাখি। বই উপহার কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে অনেক ঝামেলার শিকার হলেও আনন্দস্মৃতির কোনো অভাব নেই।
কদিন আগে দেখলাম, আমাদের দেখাদেখিতে অনেকেই বই উপহার কর্মসূচি পালন করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও অনেকে আমাদের কর্মসূচি দেখে প্রেরণা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অচিরেই তারাও হয়তো বই উপহার কর্মসূূচি পালন করবেন। তখন আরও ভাল লাগবে।
কর্মসূচির মধুর স্মৃতি
বই উপহার কর্মসূচির মধুর কিছু স্মৃতি আছে, যখন দেখি বই হাতে নিয়ে তরুণ-তরুণীরা উচ্ছ্বসিত হয়, সেলফি তোলে, আনন্দচিত্তে লাফালাফি করে, তখন সকল কষ্ট ভুলে যাই। সামান্য পরিশ্রম করে যে দৃশ্য দেখি, তাতে মনে হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অর্জনটি করে ফেলেছি। ক্ষণকালের জন্যে হলেও মানুষকে আনন্দ দিতে পারার মতো বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। অনেকেই যখন ফোন করে পড়ার জন্যে বই চায়, তখন বেশ ভালো লাগে। করোনাকালে লকডাউনের অবসরে অনেকেই ফোন করে বই চেয়েছেন, তখন খুশিতে দুলে উঠেছে মন। অনেকেই তাদের সংগঠনের অনুষ্ঠানগুলোতে পুরস্কার হিসেবে বই দিতে চায়, সে কারণে আমার কাছে আসে; আমি সাধ্যমত বই দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করি। বই বিষয়ক যে কোনো উদ্যোগের কথা শুনলে আমার ভালো লাগে।
বাধা-বিপত্তি ও লোকনিন্দা
প্রথম দিকে আয়োজনটি নিয়ে অনেকে কটাক্ষ করেছে। আজেবাজে মন্তব্য করেছে। ফোন করে ডোনারদের ভুলভাল তথ্য দিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেয়েছে। ডোনারদের ফোন দিয়ে বলেছে, আপনাদের স্পন্সর করা বইগুলো উপহারের নামে চায়ের দোকানদারকে দেয়া হয়। যার উপরে চায়ের কাপ রাখা হয়। এতে বইয়ের সম্মানহানি ঘটে।
মনোক্ষুণ্ন হয়ে আমার কাছে কৈফিত চাইত কেউ কেউ। আমি শক্তভাষায় জবাব দিয়ে বলতাম, বই কাকে দেব না দেব সেটা আমাদের ব্যাপার। আপনাদের ইচ্ছে হলে ডোনেশন করবেন, ইচ্ছে না হলে করবেন না। একজন লেখক হিসেবে আমি ভাল করেই বুঝি বইয়ের মর্যাদা কীভাবে রক্ষা করতে হয়। দয়া করে, মানুষের কথায় প্রভাবিত হয়ে আমাদের কাজে বিঘ্ন ঘটাবেন না। চা দোকানদার, তাঁতি-মুচি, কামার-কুমার, ধোপা-নাপিত সবাই মানুষ, তারা যদি পড়তে জানে- তাদরকেও বই দেব। সব ধরনের মানুষকে বই পড়ার সুযোগ করে দিতে চাই। শুধুমাত্র ধনি বাবুদের জন্যে আমরা কাজ করি না।
শুধু তাই নয়, অনেক সময় অপরিচিত নম্বরে ফোন করে করে ডোনেশন দেয়ার মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে নানান-ভাবে তামাশা করা হত। এসব হয়রানি সহ্য করেই আমরা এগিয়ে গেছি।
এভাবেই একদিন শূন্য হাতে চর্যাপদ একাডেমির বই উপহার কর্মসূচি শুরু হয়। মাত্র পৌনে তিন বছরে প্রায় ৫৫০০ (সাড়ে পাঁচ হাজার) বই উপহার দিয়েছি আমরা। এটা মনে পড়লে নিজেই বিস্মিত হই। এই সফলতার পেছনে সারাদেশের উদার মনের মানুষগুলোর আন্তরিকতাই বেশি ভূমিকা পালন করেছে। চর্যাপদ পরিবারের প্রতিটি সদস্য শ্রম-ঘাম-অর্থ বির্সজন দিয়ে উপহার কর্মসূচি বাঁচিয়ে রেখেছে। যদিও সব কিছু এখনও আমাকেই তদারকি করতে হয়। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের সকলের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এবং করব।
আমার এখন একটাই স্বপ্ন, যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি করে যাওয়া। আমি না থাকলেও যেন তাদের হাত ধরে বই উপহার কর্মসূচিটি বেঁচে থাকে যুগযুগ ধরে, সেভাবে কাজ করা।
লেখক পরিচিতি:
রফিকুজ্জামান রণি, মহাপরিচালক, চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি।
০১৭১২৭৪৯০৪৯
০১৮২৮৫৫৯০৯৩

