চট্টগ্রামে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসার

।। মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন।। ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে এবং আদর্শবান, চরিত্রবান,দেশপ্রেমিক ও দক্ষ নাগরিক তৈরীর ক্ষেত্রে এর কোন বিকল্প নেই। ইসলামের প্রথম বাণী হল শিক্ষা বিষয়ক। ইসলামী শিক্ষা সাংস্কৃতির মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল ইসলামী ভাবধারা সম্পন্ন জনগোষ্ঠী তৈরী না হওয়া পর্যন্ত মুসলিম শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় ও মজবুত হতে পারে না

বঙ্গদেশে ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি অসমান্য অবদান রাখেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ বলেন, বখতিয়ার খিলজি লখনৌতিতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি তাঁর রাজ্যের প্রত্যেকটি এলাকায় প্রচুর মসজিদ, মাদরাসা ও খানেকাহ নির্মাণ করেন।

মুহাদ্দিস শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা হাম্বলী বুখারী (রহ) হিজরী সপ্তম শতকের প্রারম্ভে ঢাকা জেলার সোঁনারগাওয়ে আগমন করেন। তিনি এখানে হাদীস চর্চা চালু এবং উচ্চ মানের মাদরাসা, খানেকাহ ও মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেন। শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামার সুযোগ্য ছাত্র ও জামাতা শায়খ শরফুদ্দীন আল মুনিরীও ব্যাপকভাবে হাদীস চর্চা ও ইসলামী শিক্ষার প্রসার ঘটান।এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় বহু প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামেও প্রতিষ্ঠিত হয়।

চট্টগ্রামে মুসলিম শাসনামলে সর্বশেষ শাসনকর্তা হলেন নবাব মীর মুহাম্মদ রেজাখান (১৭৬০ খ্রী.)। তার হাত থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬১ সালে চট্টগ্রামের শাসনভার গ্রহন। ইংরেজ আমলে ধর্মীয় শিক্ষা উপেক্ষিত হলেও ১৭৬১ সাল থেকে অদ্যাবধি চট্টগ্রামের সচেতন আলেম সমাজ, শিক্ষানুরাগী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তায় অনেক মসজিদ, মক্তব ও মাদরাসা গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্যায়ে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলার হিড়িক পড়ে যায় এবং ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার নব জাগরণের সূচনা হয়।

কওমী ধারায় ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হাটহাজারী আল জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম এবং আলিয়া ধারায় ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম আলীয়া মাদরাসার অবদান ছিল অপরিসীম। চট্টগ্রামের আলিয়া ও কওমী ধারার শীর্ষস্থানীয় কিছু দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

১। মুহসিনিয়া মাদরাসা (চিটাগাং মাদরাসা):
ইংরেজ আমলে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম সরকারি ভাবে ২০/২৪ শে জুলাই ১৮৭৪ সালে মুহসিনিয়া মাদরসা কিংবা চিটাগাং মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজী মুহাম্মদ মহসিন ফান্ডের অর্থানুকূল্যে পূর্ব বাংলা সরকারের প্রস্তাবনা ও সিদ্ধান্তের আলোকে হাজী মুহাম্মদ মহসিন ফান্ড থেকে চট্টগ্রাম মুহসিনিয়া মাদরাসার জন্য ২৭০০০ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রথমে একটি ভাড়া বাড়িতে আরম্ভ হয় এবং ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত ভাড়াটে বাড়িতে মাদরাসার কার্যক্রম চলে। ১৯৭৯ খ্রী. ৩০০০০৳ টাকা দিয়ে মাদরাসার জন্য সরকারের নিকট একটি বড় পাহাড় অধিগ্রহণ করা হয়। যার আয়তন ৩০ একর। একই সালে ভাড়া বাড়ি থেকে মাদরাসাটি এখানে স্থানান্তর করা হয়। এখানে আরবি ও এ্যাংলো পার্সিয়ান নামে দু’টি বিভাগ চালু ছিল।
১৯১৫ সালে সরকার প্রবর্তিত নিউ স্কীম পদ্ধতি চালু হলে এটি একটি হাই মাদরাসাতে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯২৭ খ্রী. এই প্রতিষ্ঠানে আই.এ কোর্স চালু করে এর নামকরণ করা হয় ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ।১৯৬৭ সালে মাদরাসা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ কলেজে রূপান্তরিত করে ১৯৭৯ সালে এর নতুন নামকরণ করা হয় হজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ।
২। ওয়াজেদিয়া কামিল (এম.এ) মাদরাসা :
ওয়াজেদিয়া কামিল মাদরাসা চট্টগ্রাম শহরের প্রাচীনতম দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। পাঁচলাইশ থানাধীন ওয়াজেদিয়ায় এ মাদরাসা অবস্থিত। ১৯০০ সালে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ নিবাসী শাহ সূফী মাওলানা ওয়াজেদ আলী খান এ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৯ সালে এ মাদরাসা একসাথে দাখিল, আলিম ও ফাজিল এর সরকারি মঞ্জুরী লাভ করে।

৩। দারুল উলুম আলিয়া মাদারাসা, চট্টগ্রাম :
দারুল উলুম মাদরাসা বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য কামিল (অনার্স মাস্টার্স) আলিয়া মাদ্রাসা।এটি স্থানীয় চান্দমিয়া সওদাগর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯১৩ সালে চট্টগ্রাম শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পিছনে মাওলানা খলিলুর রহমান বাগবানী, সুফি আহসান উল্লাহ, মোহাব্বত আলী রামুবী, ফয়জুল করিম প্রভৃতি আলেমের প্রত্যক্ষ অবদান ছিলো। মাদ্রাসাটি বর্তমানে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রয়েছে। ১৯১৩ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ১৯১৫ সালে আলিম ক্লাস খোলা হয়। ০১/০১/১৯১৮ সালে কলিকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পঞ্জুম (বর্তমানে দাখিল) সুওয়াম (বর্তমানে আলিম) স্বীকৃতি প্রাপ্ত হয় এবং মঞ্জুরী লাভ করে। ১৯১৬ সালে ফাজিল (উলা) ক্লাস চালু হলেও মঞ্জুরী লাভ করে ১৯১৮ সালে। পাকিস্তান স্বাধীনতার পর অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল মাওলানা ফজলুর রহমানের অপ্রাণ চেষ্টায় ১৯৪৭ সালে কামিল (হাদীস) খোলার অনুমতি লাভ করে।

৪। চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা:
দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলাধীন ঐতিহাসিক চুনতী গ্রামে এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবস্থিত। গাজাীয়ে বালাকোট হযরত মাওলানা আব্দুল হাকিম (রহ) ১৮১০ সালে এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ হিসেবে ২০১১ সালের ১৫ ই জানুয়ারী মাদরাসার মাঠ প্রাঙ্গণে আনজুমানে তোলাবায়ে সাবেক্বীনের উদ্যোগে ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বর্ণাট্য ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। লোকে মুখে শুনা যায়,চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসার তৎকালীন হেড মাওলানা ও হযরত আজমগড়ী (রহ) এর খলিফা মাওলানা শাহ নজীর আহমদ (রহ) ১৯৩৭ সালে চুনতী মাদরাসাকে পুন: প্রতিষ্ঠা করে মাদরাসার প্রাণ ফিরে আনেন। ১৯৭০ সালে এ মাদরাসার কামিল (হাদীস) চালু করা হয়। কিন্তু দেশের পটপরিবর্তন ও প্রতিকূলতার কারণে ০২ (দুই) চালু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৬ সালে চুনতীর ঐতিহাসসিক ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিলে সিরাতুন্নবী (সাঃ) এর প্রতিষ্ঠাতা শাহ সাহেব হাফেজ আহমদ (রহ)’র প্রচেষ্টায় কামিল (হাদীস) পুনরায় চালু করা হয় এবং ১৯৭৮ সালে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে মঞ্জুরী লাভ করে।

৫। গারাঙ্গিয়া ইসলামিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা,সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম :
দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে গারাঙ্গিয়া গ্রামে অবস্থিত এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। গারাঙ্গিয়া গ্রামে প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত হাফেজ হামেদ হাসান আযমগড়ী (রহ) এর অন্যতম খলিফা মাওলানা শাহ আব্দুল মজিদ (রহ) ১৯২০ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ মাদরাসা ১৯৩৮,১৯৪১ ও ১৯৮৪ সালে যথাক্রমে আলিম,ফাজিল ও কামিল (হাদীস) সরকারি মঞ্জুরী লাভ করে। উনবিংশ শতাব্দীর ষাটও সত্তর দশকে এ মাদরাসা চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাদৃত ছিল।

৬। জামিয়া মিল্লিয়া আহমদিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা, নজিরহাট, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম উত্তর জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী নজিরহাট বাজারের পূর্ব পাশের সড়ক সংলগ্নে এই মাদরাসাটি অবস্থিত। হযরত মাওলানা শাহ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারির নামানুসারে এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব ফরহাদাবাদ গ্রামের প্রখ্যাত বুজুর্গ হযরত মাওলানা আব্দুল হালিম (রহ) ১৯৩৯ সালে এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

৭। ছোবাহানিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রে কোতোয়ালি থানার অন্তর্গত পাথরঘাটাস্থ আছাদগঞ্জ রোড সংলগ্ন এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। চট্টগ্রামের প্রখ্যাত দানবীর ও শিক্ষানুরাগী মুহাম্মদ আব্দুস সোবহান ১৯৫১ সালে এই মাদরাসটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ মাদরাসা ১৯৫২,১৯৫৩ ও ১৯৬৪ সালে যথাক্রমে আলিম,ফাজিল ও কামিল (হাদীস) সরকারি মঞ্জুরী লাভ করে। ১৯৯০ সালে কামিল (ফিকাহ) চালু করা হয়।

৮। জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা:
চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানার বিবিরহাটে পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। পাকিস্তানে প্রখ্যাত বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব আব্দুর রহমান চৌহরভীর খলীফা মাওলানা সৈয়দ আহমদ ছিরিকোটি এলাকার শিক্ষানুরাগী লোকজনের সহায়তায় ১৯৫৪ সালে এই প্রতিষ্ঠান টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৫ সালে ফাজিল শ্রেণির সরকারি মঞ্জুরী লাভ করে। ১৯৭২ সালে কামিল (হাদীস) এবং ১৯৮৫ সালে কামিল (ফিকাহ) চালু করা হয়।

৯। রাঙ্গুনিয়া আলম শাহ পাড়া কামিল (এমএ) মাদরাসা:
চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আলম শাহ পাড়ায় মাওলানা আব্দুর রহমান ১৯৩৮ সালে অত্র দ্বীনি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রতিষ্ঠানটি তেমন কোন সুনাম ও উন্নত লাভ করতে পারেনি। ১৯৭২ সালে রাঙ্গুনিয়ার কৃতি সন্তান আ.ম.ম. শামসুদ্দিন চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া আলম শাহ পাড়া কামিল (এমএ) মাদরাসার হাল ধরেন। তিনি দক্ষতার সহিত অধ্যক্ষের দায়িত্বের পর উক্ত দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়।

১০। বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (এমএ) মাদরাসা:
চট্টগ্রাম মহানগরীর ডাবলমুরিং থানার অন্তর্গত ধনিয়ালাপাড়ায় এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন বিশিষ্ট লেখক ও সমাজ সেবক বায়তুশ শরফ আনজুমানে ইত্তেহাদ এর প্রাণ পুরুষ ও পীর সাহেব হযরত আব্দুল জব্বার (রহ) দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে আদর্শ ও চরিত্রবান নাগরিক এবং যোগ্য আলেম তৈরীর লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ সালে দাখিল, ১৯৮৮ সালে আলিম, ১৯৯৩ সালে ফাজিল এবং ১৯৯৬ সালে কামিল (হাদীস) খোলা হয়।

১১। নেছারিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা:
চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলী থানায় নেছারিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা অবস্থিত। মিরসরাই উপজেলার শাহেরখালী নিবাসী মাওলানা মুজাফ্ফর আহমদ ১৯৭৮ সালে এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮০ সালে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড,ঢাকা কতৃক দাখিল, আলিম ও ফাজিল মঞ্জুরী লাভ করে। ১৯৮৪ সালে কামিল (হাদীস) খোলা হয়।আর ১৯৮৬ সালে কামিল (হাদীস) মঞ্জুরী লাভ করে।
১২। শাহচাঁন্দ আউলিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা, পটিয়া,চট্টগ্রাম :
দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার অন্তর্গত পটিয়া পৌরসভার ০৭ নং ওয়ার্ড চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আরকান রোডের পার্শ্বস্থ বাহুলী গ্রামে প্রখ্যাত বুজুর্গ হযরত শাহচাঁন্দ আউলিয়া মাজারের সংলগ্ন এই মাদরাসাটি অবস্থিত। সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী মাওলানা নুরুল হক ১৯২৮ সালে এই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫২ সালে দাখিল, ১৯৫৮ সালে আলিম, ১৯৬১ সালে ফাজিল এবং ১৯৮৩ সালে কামিল হাদীস মঞ্জুরী লাভ করে।

১৩। আল জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম :
চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলা সদরে দেশের সর্ব বৃহৎ এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। হাকীমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর সুযোগ্য শিষ্য মাওলানা হবীবুল্লাহ রহ. (১৮৬৫ খ্রী.- ১৯৪৩ খ্রী.) মাওলানা ফজলুর রহমান মুরাদাবাদী রহ. এর অন্যতম খলিফা মাওলানা আব্দুল ওয়াদেদ (১৮৫০ খ্রী.-১৯১০ খ্রী.), মাওলানা আব্দুল হামীদ (১৮৭০ খ্রী.- ১৯২০ খ্রী) ও মাওলানা সূফী আজিজুর রহমান (১৮৬২ খ্রী-১৯২১ খ্রী) প্রমুখ মনীষীদের অপ্রাণ প্রচেষ্টায় এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৪। আল জামিয়া আল আরাবিয়া জিরি মাদরাসা, পটিয়া, চট্টগ্রাম :
দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায় এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। বৃহত্তর চট্টগ্রামে এটি দ্বিতীয় প্রাচীন কাওমী মাদরসা। হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল মাদরাসা ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ১৯১০ সালে জিরি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়। জিরির প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মাওলানা আহমদ হাছন (রহ) এর অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টায় এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

১৫। আল জামিয়া আল ইসলামিয়া জমীরিয়া কাসেমুল উলুম পটিয়া,চট্টগ্রাম :
দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায় এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। চরকানাই নিবাসী প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বুজুর্গ মুফতী আজীজুল হক (১৯০৫ খ্রী- ১৯৬১ খ্রী) স্বীয় মুর্শিদ মাওলানা জমীর উদ্দীনের পরামর্শ ও নির্দেশনা মোতাবেক ১৯৩৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৬। আল জামিয়াতুল হামিদিয়া নাছেরুল ইসলাম মাদরাসা,ফতেহপুর, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম :
হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুল হামীদ (রহ) জীবনের শেষ বয়সে ১৯১৭ সালে হাটহাজারীস্থ ফতেহপুর এলাকায় হাটহাজারী সড়ক সংলগ্নে এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এবং আমৃত্যু তিনিই মুুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন।

১৭। আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম , বাবুনগর, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম :
বন্দরনগর চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার উত্তরে ফটিকছড়ি উপজেলাধীন “বাবুনগর” গ্রামে মাদরাসাটি অবস্থিত। হাজী এমদাদুল্লাহ মোহাজেরে মক্কী (রহ) ও মাওলানা ফজলুর রহমান গাঞ্জেমুরোদাবাদি (রহ) এর খলিফা বোয়ালখালী নিবাসী মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ (রহ) হিন্দুস্থান থেকে দেশে ফিরে খান্দকিয়া এলাকায় একটি মকতব প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর তিনি মাওলানা সূফী আজিজুর রহমান এর সাথে বিশেষ সম্পর্কের কারণে বাবুনগরে এসে বর্তমান মাদরাসার উত্তর-পূর্ব পাশে পরাতন মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বে একটি মকতব প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ (রহ) ইন্তেকাল করলে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সে মকতব বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর ১৯২২ সালে হযরত মাওলানা মুসা প্রকাশ বুজুর্গ সাহেব নিজ বাড়িতে এলাকার মুসলমানের ছেলে মেয়েদের শিক্ষাদান করতেন।পরে তিনি স্বীয় মুর্শিদ মাওলানা জমিরুদ্দিন (রহ) (১৮৭৮-১৯৪০) এর সাথে রেঙ্গুন এ চলে গেলে উক্ত মকতবের শিক্ষাক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর মুফতি আজিজুল হক (রহ) এর অন্যতম খলীফা মাওলানা শাহ হারুন বাবুনগরী (রহ) হাটহাজারী মাদরাসার আলেম-ওলামাদের পরামর্শক্রমে বর্তমান মাদরাসার পশ্চিম কোণে দু’চাল বিশিষ্ট একটি কুঁড়েঘর নির্মাণ মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন। তার শায়খ মাওলানা আজিজুল হক (রহ) বাবুনগর মাদরাসায় আগমন করলে মাদরসার নাম প্রসঙ্গে আলোচনা হয়লে তিনি “আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসা” নামে নামকরণ করেন। বর্তমানে মাদরাসার নামের সাথে “আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া” শব্দ সংযোজন করা হয়।

১৮। আল-জামিয়াতুল মাদানীয়া কাশেফুল উলুম মাদরাসা,শুলকবহর,চট্টগ্রাম :
এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র কোতায়ালী থানার অন্তর্গত শুলকবহর এলাকায় অবস্থিত। শুলকবহর নিবাসী জনাব মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ১৯৬৮ সালে এই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাদরাসার প্রথম মুহতামিম ছিলেন রাঙ্গুনিয়া নিবাসী মাওলানা মুহাম্মদ ইঊসমাঈল (রহ)। তিনি প্রতিষ্ঠালগ্ন ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একটানা ২৯ বছর মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অত্র প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

১৯। আল জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া লালখান বাজার, চট্টগ্রাম :
বাঁশখালী উপজেলাস্থ ঐতিহ্যবাহী এক চৌধুরী পরিবারের কৃতি সন্তান নেজামে পার্টির চেয়ারম্যান বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা মুফতি ইজহারুল ইসলাম ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম শহরের মাওলানা শওকত আলী রোডের লালখান বাজার পাহাড়ী এলাকায় ০৮ একর জমির উপর এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।
২০। জামি’আ দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়া চান্দগাঁও,চট্টগ্রাম :
আল্লামা সুলতান যওক নদভী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী ব্যক্তিত্ব,আরবি সাহিত্যিক ও প্রতিথযশা মুহাদ্দিস। তিনি কওমী ধারায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী যুগচাহিদা ও আধুনিক ধারায় উচ্চ মান সম্পন্ন দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন দেখেন। আল্লামা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ),মাওলানা শাহ হারুন বাবুনগরী (রহ), মাওলানা মুফতি নুরুল হক (রহ), বায়তুল মোকাররমের খতীব মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ) ও অধ্যক্ষ এ.এ. রেজাউল করিম চৌধুরী সহ অসংখ্য আলেম ওলামা ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদগণের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে আল্লামা সুলতান যওক নদভী এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা আরম্ভ করেন। ১৪০৫ হিজরী ১৯৮৫ সালে দেওয়ান বাজার লেইনের মরহুম হাজী মোজাহেরুল ইসলাম সাহেবের মসজিদ সংলগ্ন ভাড়া বাসায় ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে মুরাদপুরস্থ হাজী এয়াকুব সাহেবের চারতলা বিশিষ্ট ভবনের নিচতলা ভাড়া করে পাঠদান আরম্ভ হয়। এভাবে প্রায় ০৬ মাস মুরাদপুরে শিক্ষা কার্যক্রম চলার পরে চান্দগাঁও হাজীরপুলে মরহুম সূফী মুহাম্মদ মিয়া কতৃক প্রতিষ্ঠিত মুহাম্মদীয়া জমীরিয়া কাসেমুল উলূম নামে একটি মাদরাসা ছিলো,সেখানে দারুল মা’আরিফ মাদরাসা স্থানান্তরিত করা হয়। আল্লামা সুলতান যওক নদভী সাহেবের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টায় মাদরাসাটির প্রভৃতি উন্নতি সাধিত হয়। এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে “আল হক” নামে একটি মাসিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
তাছাড়া চট্টগ্রামের প্রায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে নানাভাবে ধর্মীয় ও সামজিক ও রাষ্ট্রীয় নানাক্ষেত্রে খেদমত আন্জাম দিয়ে যাচ্ছেন ।

লেখক : কলামিস্ট।
সদস্য, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র।
প্রচার ও প্রকাশনা সচিব, বাংলাদেশ মুসলমান ইতিহাস সমিতি।

ফোকাস মোহনা.কম