
চাঁদপুর : রূপালী ইলিশের রাজধানী নামে খ্যাত চাঁদপুর। জেলার ব্র্যান্ডিংও হয়েছে ‘ইলিশের বাড়ী চাঁদপুর’ নামে। ইলিশ আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়সহ নানা কাজে জড়িত বহু মানুষ। নিবন্ধিত জেলে সংখ্যা ৪৪ হাজার ৩৫জন। পদ্মা-মেঘনা নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে ইলিশের প্রাপ্যতা কম-বেশী হয়। তবে সময়ের সাথে ইলিশ আহরণে জড়িত জেলেদের জীবন মান এখনো উন্নয়ন হয়নি। মৌলিক চাহিদা বঞ্চিত অনেক জেলে পরিবার। একই সাথে ছিন্নমূল রয়েছে শত শত পরিবার। খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করতে হয় এই জনগোষ্ঠীর। জেলের সন্তান জেলে হয়ে বেড়ে উঠছে এখনো। শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে এসব পরিবারের ছেলে-মেয়েরা।
সম্প্রতি চাঁদপুর সদর উপজেলার মেঘনা উপকূলীয় জেলে পাড়া ঘুরে এবং জেলে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানাগেছে তাদের জীবন ধারণের বর্তমান অবস্থা। উপজেলা সদরের রনাগোয়াল, দোকানঘর, লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া, হানারচর ইউনিয়নের গোবিন্দিয়া, আখনের হাট এলাকায় বসবাস করে হাজার হাজার জেলে পরিবার। এর মধ্যে মেঘনা নদীর একাধিক ভাঙনের শিকার বহু পরিবার। তারা এখন আশ্রয় নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড অর্থাৎ চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের বাঁধের দুই পাশে।
সদরের হানারচর ইউনিয়নের জেলে আলমগীর হোসেন (৪৮)। তিনি ৩৮ বছর ইলিশ মাছ ধরার কাজে জড়িত। শিশু বয়সেই নদীতে বড়দের সাথে মাছ ধরার কাজ শুরু করেন। নদীতে ভাঙনের শিকার। অন্যের জায়গায় সমিতি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋন করে ঘর তুলেছেন। ১ ছেলে ১ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ওই ঘরে থাকেন।
আলমগীর বলেন, ইলিশ মাছ আগের তুলনায় এখন খুব কম পাওয়া যায়। আগে কারেন্টজাল ছিল না। তখন বড় সাইজের ইলিশ ছিল। কারেন্টজাল আসার পর থেকে আমাদের ইলিশের আমদানি অনেকগুন কমছে। যে কারণে সংসার চালানো অনেক কষ্ট হয়। শরীরের নানা সমস্যা। টাকার জন্য চিকিৎসা করতে পারি না। অন্যের জায়গায় থাকতে হয়। খোলা আকাশের নীচে হয় রান্নার কাজ। তিনি ছোট ফাঁসের কারেন্টজাল উৎপাদন বন্ধ করতে সরকারের নিকট দাবী জানান।

একই এলাকার জেলে জাহাঙ্গীর গাজী স্ত্রী, দুই ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে থাকেন রাস্তার পাশের ছোট একটি ঘরে। তিনি বলেন, আমি ৪০ বছর জেলে পেশায় জড়িত। কিন্তু ভাগ্যের উন্নয়ন করতে পারি না। দুই ছেলে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত পড়েছে। এরপর টাকার অভাবে পড়াতে পারিনা। এখন নদীতে মাছ ধরার কাজ করে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা আমাদের জন্য খুবই কষ্ট কর। গত বছর আমার বৃদ্ধ মা চিকিৎসার অভাবে সদর হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে। আমাদের এই কষ্টের কথা কেউ শুনতে আসে না।
দক্ষিণ গোবিন্দিয়া গ্রামের জেলে নজরুর ইসলাম বলেন, হার্টের সমস্যার কারণে গত দুই বছর নদীত ইলিশ ধরতে যেতে পারেন না। তার ৪জন মেয়ে। বড় মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে। কিন্তু টাকার অভাবে বাকী পড়া বন্ধ। এখন বাড়ীতেই আছে। তিনি অন্যের জায়গায় বসবাস করেন।
ওই এলাকার বেশ কয়েকজন জেলে জানালেন, হানারচর ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাট চৌরাস্তা থেকে শুরু করে হাইমচর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার পর্যন্ত প্রায় ২ হাজারের অধিক জেলে পরিবার বসবাস করেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশ জেলে পরিবারে শিক্ষার অভাব। চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হলে জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়। সরকারি সহায়তা বলতে জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের সময় বিজিএফ খাদ্য সহায়তা চাল পান। তাও আবার সঠিক ওজনে দেয়া হয় না।
তারা আরো জানান, পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ কম পাওয়ার কারণে এখন কিছু জেলে কৃষি কাজ, রিকশা চালানোসহ অন্য পেশায় জড়িত হচ্ছেন। কারণ ইলিশ আহরণের উপর নির্ভর করে সংসার চালানো খুবই কষ্ট কর হয়ে পড়েছে। এছাড়াও অনেকেই বিভিন্ন এনজিও এবং সমিতি থেকে ঋন নিয়ে বেকায়দায় আছেন। নদীতে ইলিশ না পাওয়ার কারণে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
হাইমচর উপজেলার কাটাখালি এলাকার জেলে শফিকুর রহমান ও হারুন গাজী বলেন, জাটকা মৌসুমে অনেক জাটকা নিধন হয়। মা ইলিশ রক্ষা হয় না। প্রশাসনের নজরদারী থাকলেও খুবই কম। যে কারণে ইলিশ না পেয়ে গত কয়েকবছর আমাদের জেলে পরিবারগুলো খুবই কষ্টে আছি। সন্তানদের পড়া-লেখা ও সংসার চালানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সন্তানদেরকেও এখন বিভিন্ন কাজে দিতে হচ্ছে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য ও বনিক সমবায় সমিতি লিমিটেড এর সাধারণ সম্পাদক সবে বরাত সরকার বলেন, নদীতে পানি কম, বৃষ্টিপাতও কম হয়েছে, পদ্মা-মেঘনায় ডুবোচর, নদী তলদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে রূপালী ইলিশের প্রাপ্যতা অনেকগুন কমেছে।
চাঁদপুর সদরের জেলে নেতা তছলীম বেপারী বলেন, চাঁদপুর নৌ সীমানার জেলেদের অবস্থা আগের মত নেই। নদী মাছ থাকলে তাদের সংসার চলে, না হয় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মেঘনা নদীর প্রাকৃতিক অবস্থা বিরুপ হওয়ার কারণে ইলিশের প্রাপ্যতা কমেছে। জেলেরা দিন ও রাতে নদীতে চষে বেড়ালোও অনেক সময় জ্বালানি খরচ উঠে না।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, জেলে পরিবারগুলোতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তাদেরকে শুধুমাত্র ইলিশ আহরণ এর উপর নির্ভরশীল না থেকে অন্য কাজ করার জন্য স্থানীয়ভাবে অনেক সভা করা হয়েছে। বৃহত্তর কুমিল্লা মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গবাদি পশু, ছাগল, সেলাই মেশিন ইত্যাদি দেয়া হয়েছে। কিন্তু জেলেদের নেশা হচ্ছে মাছ ধরা। সেখান থেকে ছুটে আসতে পারে না। তবে এখন মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে।
ফম/এমএমএ/



