এখনো শোকে কাতর শহীদ আজাদের পরিবার

চাঁদপুর: গেল বছর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের নিজ এলাকায় থেকে সহযোগিতা করতেন শহীদ আজাদ সরকার। ঠিক ওই সময়ে একই এলাকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নজরে আসেন তিনি। চূড়ান্ত পর্যায়ে ৪ আগষ্ট দুপুরে দেশীয় অস্ত্রের হামলার শিকার হন তিনি। গুরুতর আহত হয়ে ওই দিনই চিকিৎসারত অবস্থায় কুমিল্লায় মারা যান আজাদ সরকার। এরপর থেকে অভিবাবকহীন হয়ে পড়ে তার পরিবার। স্বজনরা তার স্মৃতি নিয়ে শোকে কাতর।

আজাদ সরকার (৫৯)। পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (চা দোকানী)। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার টোরাগর সরকারি বাড়িতে ১৯৬৫ সালের ১১ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টোরাগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পিতা মৃত আনু মিয়া সরকার। মাতা মৃত সাহিনা রানী। দুই বোন মৃত নুর জাহান বেগম ও মৃত পারভিন আক্তার পারুল। আপন কোন ভাই নেই। দুই বোন বৈবাহিক অবস্থায় স্বামীর বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।

সম্প্রতি এই শহীদ আজাদ সরকারের বাড়িতে গিয়ে এবং তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানাগেছে।

শহীদ আজাদ সরকারের স্ত্রী লাকি বেগম (৫৫) গৃহিনী। ৪ সন্তান। বড় ছেলে রাজিব সরকার (৩৮) ও মেঝো ছেলে  মোস্তাফিজুর রহমান (৩৩) রাজমিস্ত্রি কাজ করে, আহমেদ কবির হিমেল (২৪) এসএসসি পাশ বর্তমানে এইচএসসিতে ভোকেশনালে অধ্যয়রত। ছোট ছেলে ইরফান আহমেদ সামির (২০) সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন, এখন বেকার।

আজাদ সরকার বিয়ে করেছেন একই উপজেলার হাটিলা ইউনিয়নের নোয়া পাড়া গ্রামে। শ্বশুর মৃত আশেক আলী এবং শ্বাশুড়ি মৃত আয়েশা বিবি। তারা ১৫ থেকে ২০ আগে মারা যান। আশেক আলীর দুই ছেলে। বড় ছেলে আব্দুল মানান্ন (৬০)। পেশায় তিনি কৃষক। ছোট ছেলে সুলতান মিজি (৫৫)। তিনি প্রবাসী।

শহীদ আজাদ সরকারের তৃতীয় ছেলে আহমেদ কবির হিমেল জানান, যখন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-আন্দোলন চলমান তখন হিমেলও সেই আন্দোলনে যুক্ত। তাদের পরিবার বিএনপি সমর্থিত। হিমেল নিজে ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি। জেলা সদরে আন্দোলন আগে শুরু হলেও আবু সাঈদের মৃত্যুর পর হাজীগঞ্জে আন্দোলনের মাত্রা বাড়ে। তখনই তার বাবা হিমেলকে সতর্ক থাকতে বলেন এবং গোপন থাকা অবস্থায় আর্থিক সহায়তা করেন।

হিমেল জানান, ৪ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে রাখে ছাত্র-জনতা। ওই সময় তিনি টোরাগড় নিজ বাড়ির সামনে আন্দোলনকারীদের পানি দিয়ে এবং বিভিন্ন সহযোগিতা করেন। ওই মুহুর্তে ওই এলাকার কাজী বাড়ির মিঠু কাজি ও তুষার কাজির নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল ওই বাড়ির সামনে আসে এবং হিমেলকে খোঁজে। তাকে না পেয়ে আজাদ সরকারের নিজ দোকানের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় বাম হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। সেখান থেকে তিনি নিজেই আহত অবস্থায় ঘরে আসেন এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রথমে হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রেফার করা হয়। কুমিল্লা নিয়ে ট্রমা সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সাথে সাথে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সেখান থেকে বাড়িতে এনে ওই রাতেই টোরাগড় ৭ নম্বর ওয়ার্ড বাচ্চু কমিশনারের বাড়ির সামনে নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

হিমেল স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, তার বাবাকে যখন আহত করে তার আগেই তার চোখে পুলিশের টিআরসেল লেগে মারাত্মক যন্ত্রণা শুরু হয়। তখন হিমেল ঘরে এসে মায়ের কাছে সেবা নিচ্ছেলেন। যে কারণে তার বাবার ওপর হামলার সময় প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। আমি বাবা হত্যা মামলার বাদী। এই মামলায় সঠিক তদন্ত ও জড়িতের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবী করছি।

শহীদ আজাদের স্ত্রী লাকি বেগম জানান, আহত অবস্থায় তার স্বামীকে কয়েকজন ধরে প্রথমে ঘরে আসেন। এরপর তাকে গোপনে বাড়ির পিছন দিয়ে দক্ষিণ পাড়া একটি ফার্মেসীতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। কারণ তখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মূল সড়ক অবরোধ ছিলো। অনেক বিড়ম্বনার শিকার হয়ে দুই ঘন্টা পর এম্ব্যুলেন্স পেয়ে কুমিল্লায় রওয়ানা হয়। এই সময় তিনি স্বজনদের সাথে কথা বলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পরও তিনি কথা বলেছেন। কুমিল্লা ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসারত অবস্থায় জ্ঞান ছিলো সন্তানদের খোঁজ খবর নেন। তখন আমার ছেলে হিমেল বাবাকে সান্তনা দেয়, আপনার কিছু হবে না, সুস্থ্য হয়ে যাবেন। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি ওই হাসপাতালেই মারা যান।

লাকি বেগম বলেন, শেষ মূহুর্তে বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় তার স্বামী সন্তানদের দেখে রাখতে বলেন। এরপর আর স্বামীর সাথে দেখা হয়নি। তিনি ফিরে এসেছেন তবে লাশ হয়ে। স্বামীর অনপুস্থিতিতে তিনি সন্তানদের নিয়ে এখন দিশেহারা। তার স্বামীর রেখে যাওয়া ৩ শতাংশ জমির ওপর একটি ভাঙা ঘরে বসবাস করেন। সন্তনাদের নিয়ে বেঁচে থাকতে তাদের একটি বসতঘরও প্রয়োজন।

বড় ছেলে রাজিব সরকার বলেন, বাবা থাকার কারণে আমরা কখনোই কোন কিছুর অভাব বুঝিনি। পড়া লেখা কম করেছি। যে কারণে রাজমিস্ত্রির কাজ করতাম। বাবাই আমাকে টাকা পয়সা দিয়ে কাজ পাওয়ার জন্য সহযোগিতা করতেন। বাবার এমন মৃত্যু আমরা এখন অভিভাবক শূন্য। সরকারের কাছে দাবি, সরকার যেন আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে।

মেঝো ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমার বাবা খুবই সহজ সরল মানুষ ছিলেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা দিয়ে আমাদের বরণ-পোষণের ব্যবস্থা করেছেন। তার অবর্তমানে আমরা এখন দিশে হারা। বাবা হত্যার সঠিক বিচার দাবী করছি।

এদিকে আজাদ সরকারের মৃত্যুর পরে এই ঘটনায় ১৫জনকে আসামী করে হাজীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছে তৃতীয় ছেলে আহমেদ কবির হিমেল। এই ঘটনায় হাজীগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং কেউ গ্রেপ্তারের পর জামিনে আছেন। সর্বশেষ প্রধান আসামী মিঠু কাজী গ্রেপ্তার হয়েছেন। মামলাটি বর্তমান চলমান রয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে গেল বছর ৬ সেপ্টেম্বর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আজাদ সরকারের মরদেহ উত্তোলন করে ময়না তদন্ত করা হয়।

আজাদ সরকারের সরকারি জুলাই-আগষ্ট শহীদ গেজেট নম্বর ৬৭২। মেডিকেল কেস নম্বর: ২২৮০৫। এই পরিবার এখন পর্যন্ত জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৫লাখ টাকা, জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে প্রথম বার ২০ হাজার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ১০ হাজার, ডিসি অফিস থেকে দ্বিতীয় বার ২লাখ টাকা, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা, বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে। এছাড়াও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পেয়েছে এবং বাকি সঞ্চয়পত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেয়া হয়েছে।

ফম/এমএমএ/

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | ফোকাস মোহনা.কম