ইতিবাচক মনোভাবের মাধ্যমেই সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব

মোঃ মহসিন হোসাইন।। কথায় আছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলান জীবন বদলে যাবে। অর্থাৎ আমাদের জীবনকে আমরা কোন পথে অতিবাহিত করতে চাই সেটা নির্ভর করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির উপরে। আশাবাদী এবং উদ্যম মনোভাব একজন মানুষের সফলতা অর্জনের পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনি যদি কোনো দলের নেতা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ইতিবাচক মনোভাব আপনার দলের অন্যান্য সদস্যদেরকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহস যোগাবে। আর তাই আজ আমরা আলোচনা করব কীভাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব উন্নত করতে পারি।

বর্তমানে অর্থনীতির সঙ্গে মানবিক প্রগতির কথা বলা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলছেন। কিন্তু যেটিই বলা হোক না কেন, সেটির প্রয়োগ সমাজ বা রাষ্ট্রে সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, তা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

এর কারণ হচ্ছে, এখন যেভাবে উন্নয়নের ধারণা প্রচলিত আছে- তা অনেকটা ম্যাটারিয়ালিস্টিক; যেখানে মানুষের মনকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং ব্যবসায়িক বা কৃত্রিম দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে মানুষের ভেতরে যে ভাবনা সৃষ্টি হওয়ার কথা তা কোনোভাবেই হচ্ছে না। আর ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে না বলে মানবিক যে গুণাবলীগুলো নিয়ে মানুষের বেড়ে উঠার কথা ছিল, তা বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না।

আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। নিজের মনোভাব বা মানবীয় গুণাবলী ধারণ করে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার কথা থাকলেও সেটি হচ্ছে না। এ পরিবর্তনের প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রকে কিভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে, সে বিষয়গুলোও ভাবতে হবে।

এখানে একটি বিষয় বলা যায়, স্বল্পমেয়াদে মানুষের মধ্যে এ ধরনের মনোভাব গড়ে উঠেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতিবাচক মানবিক ভূমিকা এ ধরনের অবস্থা তৈরি করেছে। যেমন এক্ষেত্রে সততা ও নৈতিকতার বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে।

একটি কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, এখন মানুষ আর আগের মতো নেই। এখানে মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব যে আগের মতো নেই সেই বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। অথবা অন্যভাবে বলা যায়, মানুষ ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়ে তার যে মানবিক আচরণ করার প্রয়োজন ছিল, তা তার মধ্যে কোনোভাবেই কাজ করছে না। ফলে তার কাছে কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ- তা বিচার করার মানবিক গুণাবলী বজায় থাকছে না।

যেমন অবৈধ উপার্জন যে একটি মন্দ কাজ, মানুষ তা বুঝে উঠতে পারছে না অথবা সেটি বোঝার মতো শক্তি তার থাকলেও সেটি তার মনকে প্রভাবিত করছে না। এ ধরনের অসততাকে সে জীবনের অংশ বলে মনে করছে।

আবার এ অসততাকে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের যুক্তি তুলে ধরছে। কিন্তু এর দ্বারা যে দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও রাষ্ট্র নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবকে পরিবর্তন করছে, তা নিয়ে খুব একটা ভাবা হচ্ছে না।

বর্তমান সময়ে মাদকের বিষয়টি সমাজের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে ক্রিয়াশীল হয়েছে। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবেশ করে মানুষের চিন্তাশক্তি ও স্বকীয়তা ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেললেও তার মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা ও সমাধানের কোনো পরিকল্পনা বা নীতি গ্রহণ করা যাচ্ছে না।

এর কারণ হল মানুষের মনের ভেতর যে সুপ্ত চেতনা রয়েছে, তার প্রকাশ ঘটছে না। অনেকেই মাদককে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে বরং এটিকে তার ব্যবসায়ের অংশ মনে করছে। তার এ মাদক ব্যবসায়ের কারণে সামাজিক অবক্ষয় যেমন ঘটছে, তেমনি মাদকের ছোবলে তার পরিবারও যে আক্রান্ত হতে পরে- সে বোধশক্তি তার মধ্যে কাজ করছে নামহ

আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তা হল- মানুষের মধ্যে বাস্তবতা কাজ না করে ইদানীং কল্পনাশক্তি কাজ করছে। ফলে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা না ঘটলেও তার কাল্পনিক প্রচারণা মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে।

অনেকে ভাবছেন, শিক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তন হলেই প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি রোধ করা যাবে। কিন্তু এ ধরনের ভাবনা অনেকটাই অযৌক্তিক ও কল্পনাপ্রসূত। কারণ একজনের পরিবর্তে অন্যজনকে শিক্ষার দায়িত্ব দেয়া হলে যে একই ধরনের ঘটনা ঘটবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কারণ এখানে মানুষের চেয়ে মানুষের মনের প্রভাব অনেক বেশি। যতক্ষণ পর্যন্ত না সমাজের সর্বস্তরে মানুষের নেতিবাচক আচরণকে প্রভাবিত করে ইতিবাচক আচরণে পরিবর্তন করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের অসততার বিষয়গুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘটতেই থাকবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে কোনো একটি সমস্যার জন্য অযৌক্তিকভাবে একজন আরেকজনকে দোষারোপ করে। দোষারোপের সংস্কৃতি যেখানে যত বেশি প্রবল, সেখানে তার সমাধান ও উত্তরণের সংস্কৃতিও তত বেশি দুর্বল।

মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেভাবে কৃত্রিম অভিনয় করে চলেছে, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের শিক্ষাদানের দায়বদ্ধতার বিষয়টি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। অনেকে বলে থাকেন- আগে যে ধরনের প্রথিতযশা ও গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ভালো মানের শিক্ষক ছিলেন, আজকাল তেমনটি আর দেখা যাচ্ছে না।

বিষয়টি অনেকাংশেই সত্য। কারণ আগে যারা শিক্ষকতা করতেন, তাদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ছিল, যা বর্তমানে নেই বললেই চলে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষকদের মধ্যেও জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের চেয়ে বাণিজ্যিকীকরণের মনোভাব গড়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষা ও গবেষণায় যেভাবে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত হওয়ার কথা ছিল, তা অনেকাংশেই কমে যাচ্ছে।

এর বদলে শিক্ষক নিজেকে শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এক ধরনের কৃত্রিমতাকে বেছে নিচ্ছেন। এটি কেবল শিক্ষকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষ তার নিজস্ব দায়িত্ব ও নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে এ ধরনের অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।

আশঙ্কার বিষয় হল, স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব পরিলক্ষিত না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি যে সমাজকে গ্রাস করতে পারে, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে না।

বর্তমানে সমাজের মধ্যে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে বা তৈরির চেষ্টা চলছে, তার প্রধান কারণ হল- মানুষের মন ধীরে ধীরে নেতিবাচক শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। কারণ ইতিবাচক শক্তির দৃষ্টান্ত সমাজে বিদ্যমান থাকলেও তা প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে মানুষের মনকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করার পদক্ষেপ তেমন একটা নেই বললেই চলে।

কিন্তু নেতিবাচক প্রচারণাগুলো ইতিবাচক প্রচারণার চেয়ে প্রাধান্য পাওয়ায় এক সময় মানুষের মন ইতিবাচক থাকলেও তা ধীরে ধীরে নেতিবাচক ধারণাকে গ্রহণ করছে। এখন দরকার মানুষের মন নিয়ে গবেষণা করা। মানুষের মনকে কিভাবে প্রভাবিত করে ভালো-মন্দ বোঝার শক্তি তৈরি করা যায়, তা গভীরভাবে ভাবতে হবে।

লেখক পরিচিতি: মোঃ মহসিন হোসাইন।
লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
কেন্দ্রীয় সভাপতি- মানবতার ডাক সাহিত্য পরিষদ।

ফোকাস মোহনা.কম