আলোর দুহিতা সেলিনা হোসেন (নিবন্ধ)

এস ডি সুব্রত।। সাহিত্যের দর্পণে প্রতিফলিত হয় একটি জাতি তথা একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক জীবনপ্রণালি। সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাবলী। সাহিত্য মানেই তো জীবন। সাহিত্যের নিরংকুশ সংঞ্জা দেয়া মুশকিল । সাহিত্য শব্দটি ‘সহিত’ শব্দ থেকে উদ্ভূত। সহিত অর্থ সংযুক্ত, সমন্বিত, হিতকর, সঙ্গে, সাথে। জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শিল্পসমন্বিত বাক্য বিন্যাসই সাহিত্য। সাহিত্য শব্দটি ‘সম্মিলন’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। সম্মিলন হলো মনে-মনে, আত্মায়-আত্মায়, হৃদয়ে-হৃদয়ে মিলন। সাহিত্য মানবজীবনের দর্পণস্বরূপ। মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আস্থা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় সাহিত্যে । সত্য যখন শব্দশিল্পের পরশে সুন্দর হয়ে প্রকাশিত হয়, তখন তা যুগ-যুগ ধরে সংবেদনশীল হয়ে মানুষের মনে রস-আবেদন সৃষ্টি করে।

তাই সাহিত্যে যে-কোনো মুক্তিকামী জাতির কথা যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি স্পষ্ট হয় মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধের শৈল্পিক প্রভাব পড়ে সাহিত্যের ওপর। সাহিত্য বহতা নদীর মতো অস্থিতিশীল। নদীর মতো সাহিত্যেরও রয়েছে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা।

পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশ উপন্যাসে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যা নানা পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্যে সৃষ্টিশীলতায় আজো প্রবহমান। বাংলাদেশে উপন্যাসের পালাবদলের যে-ধারা তা লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, আমাদের উপন্যাসের অধিকাংশই সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এই সময়ের স্রোত বেয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধ, সৃষ্টি হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসসমূহের মধ্যে শহীদ আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত, শওকত আলীর যাত্রা, শওকত ওসমানের নেকড়ে অরণ্য, জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি, রশীদ হায়দারের খাঁচায় অন্ধ কথামালা, সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড, গায়ত্রী সন্ধ্যা, ত্রয়ী, কাকতাড়ুয়া, মাহবুবুল হকের জীবন আমার বোন, রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা, রাবেয়া খাতুনের মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, রশীদ হায়দারের নদী ও বাতাসের খেলা, হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে, নির্বাসন, জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প এবং ইমদাদুল হক মিলনের কালো ঘোড়া, পরাধীনতা উলেস্নখযোগ্য। বাংলা উপন্যাসের এই বিশেষ ধারাটি মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফল । মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ এবং অনন্য শিল্পঘনিষ্ঠ কর্ণধার সেলিনা হোসেন । শৈশব ও কৈশোর কেটেছে করতোয়া ও পদ্মাবিধৌত নদী-অববাহিকা রাজশাহী শহরে। দুই নদীর মাতোয়ারা স্রোত তাঁকে উদার বানিয়েছে। জীবন শিখিয়েছে। রাজশাহীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা যেমন ছিল, ততোধিক আগ্রহ ছিল সাহিত্যে। ১৯৬৯ সালে ছোটগল্প বিষয়ে প্রবন্ধ রচনার জন্য সেলিনা হোসেন ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক লাভ করেন। জীবনের নানা মাত্রিকতায় তিনি অনুধাবন করেছেন সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবেশকে।’

তাঁর প্রথম উপন্যাস জলোচ্ছ্বাস (১৯৭২) থেকে শুরু করে হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬), মগ্ন চৈতন্যে শিস (১৯৭৯), যাপিত জীবন (১৯৮১), নীল ময়ূরের যৌবন (১৯৮২), পদশব্দ (১৯৮২), পোকা মাকড়ের ঘর বসতি (১৯৮৬), নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি (১৯৮৭), ক্ষরণ(১৯৮৮), কাঁটাতারে প্রজাপতি (১৯৮৯), গায়ত্রী সন্ধ্যা (১৯৯৪), দীপান্বিতা (১৯৯৭), যুদ্ধ (১৯৯৮), একটি উপন্যাসের সন্ধানে (১৯৯৯), যমুনা নদীর মুশায়রা (২০১১) পাঠক নন্দিত । ফাউন্ডেশন অব সার্ক রাইটার্স অ্যান্ড লিটারেচার-আয়োজিত সার্ক লেখক সম্মেলনে গিয়ে তিনি কবি গালিবের কবর দেখতে যান। সেখানে গালিবের কবরটি অযত্ন-অবহেলায় দেখে তাঁর মন খারাপ হয়ে যায়। কবরের পাশের লাইব্রেরি থেকে তিনি কিছু বই কিনে ফিরে আসেন। তারপর থেকেই তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে কবি মির্জা গালিবকে নিয়ে রচিত বিভিন্ন ভাষার নানা বই-পুস্তক সংগ্রহ এবং তা আত্মস্থ করেন। একাত্তর বছরে পা দিয়ে তিনি বলেছেন—” জন্মগ্রহণ করেছিলাম সাতচলিস্নশ সালে। বড় হয়ে জেনেছি দেশভাগ হয়েছে। পাকিস্তান নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এই অর্থে আমি দেশভাগ দেখেছি। ভাষা আন্দোলন বুঝিনি। বাহান্নোর সেই সময়ে নিজের ভাষায় কথা বলেছি। কিন্তু মাতৃভাষার মর্যাদা বোঝার বয়স ছিল না। মহান মুক্তিযুদ্ধের একাত্তর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। একাত্তর আমার জীবনের একটি সংখ্যা বা শব্দ মাত্র নয়। শব্দটি আমার অস্তিত্ত্বের একটি অংশ। এ কারণে একাত্তর বয়সের সূচনার জন্মদিন আমি ভিন্নমাত্রায় দেখছি।’

সেলিনা হোসেনের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে চলিশটি উপন্যাস, সাতটি গল্পগ্রন্থ এবং চারটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তাঁর রচনা দুই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল আলোক বিচ্ছুরণে বিভাসিত। তাঁর গ্রন্থসমূহ ইংরেজি, ফরাসি, জাপানি, কোরিয়ান, ফিনিস, আরবি, মালয়ালম, স্প্যানিশ, রুশ, মালেসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, রবীন্দ্র মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ডসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট প্রাপ্ত হয়েছেন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘জলোচ্ছ্বাস’। উপন্যাসটিতে তার শৈশবের প্রকৃতি, বঙ্গোপসাগর এবং অসংখ্য নদী-নালা দেখে চিত্রকল্প খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছেন। এখানে বাবার চাকরির সুবাদে তার শৈশবের বেড়ে ওঠা বগুড়া শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদী ও জলার দৃশ্যের ছায়া দেখা যায়। স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশে ফিরে এসেছে স্বৈরশাসন। কিন্তু তিনি কখনোই স্বৈরশাসন মেনে নিতে পারেননি। বরং তার প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে তার লেখা ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ উপন্যাস, যেখানে সামরিক শাসনের নানা প্রসঙ্গ এসেছে। ছিটমহল প্রসঙ্গ নানাভাবেই আমাদের দেশে আলোচিত। লেখিকা নিজে দহগ্রামণ্ডআঙ্গরপোতা এবং পঞ্চগড় এলাকার অনেকগুলো ছিটমহল ঘুরে দেখেছেন তার ভ্রমণের নেশা থেকে। সেখানে জীবনের সংকট ও নিয়ন্ত্রিত জীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে লেখেন ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসটি। সেলিনা হোসেন জীবনে বিরূপ অভিজ্ঞতাকেও নান্দনিকভাবে উপন্যাসে রূপান্তর করেছেন। এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান তার প্রিয় মেয়ে বৈমানিক ফারিহা লারা। তার স্মৃতি ও যন্ত্রণা থেকে লেখেন ‘লারা’ উপন্যাসটি। এটি তার ব্যক্তিগত স্মৃতিজাত হলেও তাতে মা-মেয়ের সম্পর্কের চিরন্তন সত্য ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ সেলিনা হোসেনের একমাত্র ট্রিওলজি । ১৯৯৪ সাল থেকে যথাক্রমে এর খণ্ডগুলো প্রকাশ হয়। এতে তিনি ৪৭ থেকে ৭৫ কালপর্বের সবগুলো রাজনৈতিক ঘটনার অভিঘাত চিত্রিত করতে চেয়েছেন। উপন্যাসটির জন্য তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ পেয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত তার গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘যাপিত জীবন।’ ১৯৮১ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি পরে তিনি পরিবর্ধন করে বৃহৎ কলেবর দিয়েছেন। এটি এখন পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্র্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিভুক্ত। এ ছাড়া শিলচরের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ৫টি উপন্যাস এমফিল গবেষণাভুক্ত হয়েছে। তবে তার সবচেয়ে আলোচিত ও বিখ্যাত উপন্যাস বলা যায় ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। ১৯৭৬ সালে এটি প্রকাশের পরই বোদ্ধাজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে এটি প্রাতঃস্মরণীয়। উপন্যাসটি নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ৭৫-এর পটপরিবর্তন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ও তার নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে তা আর করা হয়নি।

‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতিও এনে দিয়েছে। ১৯৮৭ সালে এটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ হয় । ২০০১ সালে উপন্যাসটি ভারতের কেরালা থেকে মালয়ালাম ভাষায় অনূদিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পেরোনোর পর তিনি বিভিন্ন পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে নিয়মিত লিখতেন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে তার প্রাতিষ্ঠানিক কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ৩৪ বছরের কর্মসময়ে তিনি বাংলা একাডেমির অভিধান ও বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলি প্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পাদন করেন। ২০ বছরেরও বেশি সময় ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন।

তিনি বিভিন্ন সময় ঐতিহাসিক বিষয় ও চরিত্রের সমকালীন প্যারালালধর্মী উপন্যাস লিখেছেন, যা লেখিকার ভাষায় ‘ঐতিহ্যের নবায়ন’। তিনি মোগল আমলের বিখ্যাত কবি মির্জা গালিবের জীবনী নিয়ে লেখেন ‘যমুনা নদীর মুশায়েরা’। এতে গালিবের জীবনের এক ধরনের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। অগ্নিযুগের বিপ্লবী প্রীতিলতাকে নিয়ে লেখেন ‘ভালোবাসা প্রীতিলতা’।’ নীল ময়ূরের যৌবন’ তার ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্য। ১৯৮৩ সালে উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ হয়। ২০০০ সালে ইংরেজিতে অনুবাদ হয় তার ‘টানাপড়েন’ উপন্যাসটি। ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ উপন্যাসে দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের মানুষের জীবনের খুবই বাস্তব এবং জটিল একটি অধ্যায় তুলে ধরেছেন সেলিনা হোসেন। শোষিত শ্রেণির উত্থানে শাসক শ্রেণির মধ্যে যে হিংসা, আতঙ্ক দেখা দেয় এবং এ থেকে উদ্ভূত ক্রোধ তাদের নিকৃষ্ট কাজ করতেও বাধা দেয় না- সে ব্যাপারটা তিনি কৃতিত্বের সঙ্গেই দেখিয়েছেন
১৯৪৭-এ দেশভাগ, রাজনৈতিক বিভাজন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সঙ্গে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের (যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত) ভয়াবহতায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া কিছু পরিবারের চিত্র নিয়ে লেখেন ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’।

তাঁর লেখা সম্পর্কে অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন — ‘ইতিহাসের গভীরে সন্ধানী আলো ফেলে ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন সৃষ্টিতে তাঁর সৃষ্টি কিংবদন্তিতুল্য। ” সেলিনা হোসেন আমাদের কথা সাহিত্যের কথাসাহিত্যের আলোর দুহিতা । বাংলা কথা সাহিত্য জীবিত রাজকন্যা সেলিনা হোসেন এর কলমের আলোয় আলোকিত হয়েছে দারুণ ভাবে।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ ।
sdsubrata2022@gmail.com

ফোকাস মোহনা.কম